Follow us

করোনাভাইরাস ও আসন্ন রমজান: সতর্কতা ও রীতিনীতির দ্বন্দ্বে মুসলিম সমাজ

বেনারনিউজ স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2020-04-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রা প্রদেশের পাদাং-এর গ্রেট মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ছেন মুসলিম নারীরা। ২৬ মে ২০১৭।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রা প্রদেশের পাদাং-এর গ্রেট মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ছেন মুসলিম নারীরা। ২৬ মে ২০১৭।
[সুলতান আজম/বেনারনিউজ]

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আসন্ন রমজান ও ঈদে প্রচলিত রীতিনীতি বনাম দুর্যোগকালীন প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন মুসলিম দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ।

মঙ্গলবার বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি জোকো উইদোদো সরকারি কর্মচারীদের রমজান মাসে নিজ নিজ অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যের সুলতান শরাফউদ্দিন ইদ্রিস শাহ ঘোষণা দিয়েছেন কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তিনি এবার জামাতে তারাবি নামাজে অংশ নেবেন না।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার সাধারণের জন্য মসজিদে দৈনিক পাঁচ বেলা নামাজ ও শুক্রবারে জুম্মার নামাজ নিষিদ্ধ করলেও রমজান মাসে তারাবি নামাজের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

রমজান মাসের প্রাক্কালে বিভিন্ন সরকারের এসব ঘোষণা মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রোজার শেষে ঈদ করতে গ্রামের বাড়িতে ফেরা, রমজানে মসজিদে গিয়ে তারাবির নামাজ পড়া, প্রতিদিনের ইফতারের সামগ্রী কেনাকাটাসহ সবকিছু নিয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন তাঁরা।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এপ্রিলের ২৩ অথবা ২৪ তারিখ শুরু হবে রমজান মাস। এক মাস সিয়াম সাধনার পরই ঈদ।

এ অবস্থায় জোকো উইদোদো ঘোষণা করেছেন, “আমরা আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাসদস্য, পুলিশ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা ঈদ উপলক্ষে এবার বাড়ি যেতে পারবেন না।”

প্রায় সাড়ে ২২ কোটি মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ, দেশটিতে পুলিশ ও সেনাসদস্য রয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ।

এদিকে একই নির্দেশনা দেশের বাকি মানুষের ওপর আরোপ করা হবে কিনা তা নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি।

“এই মহামারির সময়ে যারা কাজ এবং উপার্জন হারিয়েছেন তাঁদের রাজধানী থেকে গ্রামে ফেরার ব্যাপারে আমরা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারি না,” বলেন উইদোদো।

অন্যদিকে শরাফউদ্দিন ইদ্রিস শাহ’র ব্যক্তিগত সহকারী মোহাম্মদ মুনির বানি বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, “ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সুলতান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার তিনি ইফতার অনুষ্ঠান এবং দেশের বিভিন্ন মসজিদে তারাবির নামাজে জনগণের সঙ্গে অংশ নেবেন না।”

“করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে সুরক্ষার নানা বিষয় বিবেচনা করে সুলতান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,” মন্তব্য করে বানি বলেন, “তাছাড়া জামাতে একত্রিত হলে জনগণের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

এদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই ইন্দোনেশিয়ার শহরাঞ্চলে বসবাস করা অনেকে করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছরে ঈদের জন্য ভ্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মার্চের শেষ দিকে প্রায় তিন লাখ মানুষ আগাম কিনে রাখা রমজান মাসের ট্রেনের টিকিট বাতিল করেছেন বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় রেলপথ কোম্পানির একজন মুখপাত্র।

“আমি এই বিপদের সময়ে ঝুঁকি নিতে চাই না। জুলাইয়ে যখন ছুটি হবে তখন বাড়ি যাব,” বেনারকে বলেন জাকার্তার কলেজ ছাত্র ভেরায়ন্তী, যিনি ঈদের এক সপ্তাহ আগে বাড়ি যাবার জন্য আগাম কিনে রাখা ট্রেনের টিকিট বাতিল করেছেন।

তবে জাকার্তায় বেসরকারি খাতে কর্মরত জাভা দ্বীপের মধ্যাঞ্চলীয় শহর পুর্নজয়ের বাসিন্দা ২২ বছরের ইয়ানিও বাড়ি যাবার টিকিট বাতিল করার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

“পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমি ঈদে বাড়ি যেতে চাই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমি বাড়িতে রোগ বয়ে নিয়ে যেতে পারি। আশা করছি ঈদের আগে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে,” বেনারকে বলেন ইয়ানি।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ২৯৩ জন। এই রোগে দেশটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২৮০ জন, যা চীন ছাড়া করোনাভাইরাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যু।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা মেনে ইন্দোনেশিয়ার বালির একটি মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ছেন মুসল্লিরা। ২০ মার্চ ২০২০। [এপি]
করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা মেনে ইন্দোনেশিয়ার বালির একটি মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ছেন মুসল্লিরা। ২০ মার্চ ২০২০। [এপি]

মালয়েশিয়ার সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা

মালয়েশিয়ার একাডেমি অফ মেডিসিন বুধবার এক বিবৃতিতে সরকারকে জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের আদেশ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। জনসাধারণের চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে জারি করা সরকারের চলতি আদেশটির মেয়াদ ১৪ এপ্রিল শেষ হবে।

“চলাচলে নিষেধাজ্ঞা অসময়ে প্রত্যাহার করে নিলে অথবা বেশি মাত্রায় শিথিল করলে এই চার সপ্তাহ ঘরে থাকার যে সুফল এসেছে তা ভেস্তে যেতে পারে। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হতে এখনো বহু দেরি। আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং এবছর আরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে,” বিবৃতিতে জানায় দেশটির চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্বকারী এই একাডেমি।

এর আগে, ফেডারেল টেরিটরি মন্ত্রী আনোয়ার মুসা রমজান মাসের উন্মুক্ত বাজার নিষিদ্ধ বা পদ্ধতি সংশোধন করা যায় কিনা তা বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রমজানের বাজারে অল্প জায়াগায় অনেক দোকান এবং প্রচুর মানুষের সমাগমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এই ধরনের বাজার এখন গ্রহণযোগ্য না। আমরা সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিতে না পারলেও, সংশোধন করতে পারি। এ বছর একই জায়গায় ৫০টি দোকান না রেখে তা ১০ জায়গায় ছড়িয়ে দেখতে পারি।”

তবে সেলেঙ্গর, নেজেরি সেম্বিলান, তেরেংগানু, সারাওয়াক, পেনাং, মালাক্কা এবং কেদাহ- এই সাতটি রাজ্যের কর্মকর্তারা তাঁদের এলাকায় ইতিমধ্যেই রমজানের উন্মুক্ত বাজার নিষিদ্ধ করেছেন।

“কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,” গত সপ্তাহে বলেন নেগেরি সেম্বিলানের মুখ্যমন্ত্রী আমিনউদ্দিন হারুন।

“ব্যবসায়ীদের আরও শৃজনশীল হতে হবে। আমরা তাঁদের উন্মুক্ত জায়গায় এভাবে ব্যবসা করতে দিতে পারি না, কারণ আমরা ঝুঁকি নিতে চাই না। আমরা আশা করব আপাতত সবাই ধৈর্য্য ধরবেন,” সাংবাদিকদের বলেন তিনি।

সেলানগর রাজ্যের ক্লাং অঞ্চলের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী ফারহান ইয়াসিন জানান, উন্মুক্ত বাজারে দোকান দেওয়াই রমজান মাসে তাঁর পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। এই বছর রমজানে বিক্রির জন্য মালামাল কিনতে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই পরিবারটি প্রায় ২৩০০ ইউএস ডলার ব্যয় করেছে।

“আমরা সাধারণত শাহ আলম স্টেডিয়ামের বাজারে বিক্রি করি। কিন্তু এবার আমরা ঐ বাজারে দোকান দেওয়ার কোনো জায়গা পাইনি। তাই আমরা ভাবছিলাম পাড়ার মধ্যেই দোকান দেবো। কিন্তু লক ডাউনের কারণে আমাদের এখন অন্য উপায় খুঁজতে হবে,” বেনারকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশের উদ্বেগ

রমজানে মসজিদে জামাতে তারাবির নামাজ বাতিল করা হবে কিনা সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।

“রমজান মাসে মসজিদে তারাবির নামাজ নিরুৎসাহিত করব কিনা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা দ্বিধায় রয়েছি,” বেনারকে বলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আনিস মাহমুদ।

“তবে আমাদের এখনো সময় আছে। আমরা ইসলামী স্কলারদের কাছে মতামত চাইব। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা একটি বিশেষ সভা আয়োজন করব,” বলেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশ জমিয়াতুল উলেমার চেয়ারম্যান ইসলামি বিশেষজ্ঞ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ বেনারকে বলেন, “রোজার সময় লাখ লাখ মুসলমান তারাবির জন্য মসজিদে যাবে এবং ঈদের জন্য লাখ লাখ মানুষ শহর থেকে গ্রামে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটবে, এটা নিয়ে উদ্বেগে আছি।”

“করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের বড় সমাবেশ এড়াতে হবে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “রমজানের সময় তারাবি নামাজের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়ার আগে সরকারের উচিত হবে ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া।”

“তবে আমি বলব, জনগণ যেন এবার ঈদ করার জন্য বাড়ির দিকে না যায়,” যোগ করেন ফরিদ উদ্দিন মাসুদ।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি শপিং কমপ্লেক্সে ঈদের কেনাকাটায় মানুষের ভিড়। ১১ জুন ২০১৮। [এস মাহফুজ/বেনারনিউজ]
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি শপিং কমপ্লেক্সে ঈদের কেনাকাটায় মানুষের ভিড়। ১১ জুন ২০১৮। [এস মাহফুজ/বেনারনিউজ]

থাইল্যান্ডে জুম্মার নামাজ

থাইল্যান্ডের সাইখুল ইসলামের পরিচালক উইসুত বিনলাতেহ বলেছেন রমজানে তাঁদের বড় উদ্বেগ তারাবির নামাজ নিয়ে। কারণ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেখানকার কিছু ইমাম শুক্রবার জুম্মার নামাজ জামাতে পড়িয়েছেন।

“মসজিদে না গিয়ে মুসলমানরা বাড়িতে তারাবি পড়তে পারে। বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে রোজা রাখতে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না,” বেনারকে বলেন তিনি।

যারা সাইখুল ইসলামের আদেশ অমান্য করেছে তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, “যে সব ইমাম শুক্রবার মসজিদে জুম্মা পড়িয়েছেন তাঁদের আমরা বরখাস্ত করার কথা ভাবছি। অন্যান্য শাস্তির বিষয়েও ভাবা হতে পারে।”

সমোঝতায় ফিলিপাইন

ইউনাইটেড ইমাম অব দি ফিলিপাইনের সভাপতি আলীম সা’দ আমাতে বলেছেন, মুসলমানরা নিজেদের ইমান অটুট রেখেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে শিখেছে।

ম্যানিলার কেন্দ্রস্থল লুজন দ্বীপ কয়েক সপ্তাহ থেকে লকডাউন অবস্থায় রয়েছে। একটি টাস্কফোর্সের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রদ্রিগো দুতার্তে এ সপ্তাহে লকডাউনের মেয়াদ এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন।

এর অর্থ হচ্ছে জাকিয়া লাও তাঁর বাড়িতে যেতে পারছেন না। জাকিয়া লাও দক্ষিণের শহর মারাওয়ির বাসিন্দা, যে শহরটি ২০১৭ সালে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের ৫ মাসের অবরোধের সময় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল।

“আমি লকডাউনের কারণে মারাওয়ি যেতে পারব না,” বেনারকে বলেন তিনি।

“রোজা চলবে। আমরা করোনায় আক্রান্ত হইনি এবং করোনা আমাদের রোজা থেকে বিরত রাখতে পারে না, কারণ এটি হলো সংযম,” বলেন লাও। “তবে সামাজিক দূরত্বের কারণে মসজিদে নামাজ ব্যহত হবে,” বলেন তিনি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন থাইল্যান্ডের পাতানি থেকে মরিয়ম আহমদ, কুয়ালালামপুরের হাদি আজমি, ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী, জাকার্তা থেকে টিয়া আসমারা ও রোনা নির্মলা এবং ফিলিপাইনের কোটাবাটো থেকে জেফ্রি মাইতেম ও মার্ক নাভালস।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন