একই দিনে লকডাউন, রমজান ও বাংলা নববর্ষ শুরু, ঢাকা ছাড়ছে মানুষ

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-04-13
Share
একই দিনে লকডাউন, রমজান ও বাংলা নববর্ষ শুরু, ঢাকা ছাড়ছে মানুষ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কঠোর লকডাউন ঘোষণার পাশাপাশি গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়ায় ট্রাকে করে ঢাকা ছাড়ছে কয়েকটি পরিবার। ছবিটি মাওয়া ফেরিঘাট এলাকা থেকে তোলা। ১৩ এপ্রিল ২০২১।
[সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]

বাংলা নববর্ষ, পবিত্র রমজান এবং মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সর্বাত্মক লকডাউন, বাংলাদেশে তিনটাই একসাথে শুরু হচ্ছে বুধবার। 

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে আগে থেকেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাসট্রেনলঞ্চ। ফলে লকডাউন শুরুর আগে ঢাকা ছাড়তে হিমশিম খাচ্ছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই ছোট ছোট পরিবহনে যে, যার মতো পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন গ্রামের বাড়িতে। 

বাংলা নববর্ষ ১৪২৮, রমজান ও লকডাউনের প্রেক্ষাপটে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “মানুষের জীবন সর্বাগ্রে। বেঁচে থাকলে আবার সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া যাবে। 

অসুবিধা হলেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী লকডাউনে ঘরে বসে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।  

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেতার-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সব ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে পবিত্র মাহে রমজানের মোবারকবাদ জানান।

ঢাকা ছাড়ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ

লকডাউনের ঘোষণায় মঙ্গলবার দিনভর ঢাকা ছেড়েছে মানুষ। কিন্তু বাস, ট্রেন ও লঞ্চসহ দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ট্রাক, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশায় গাদাগাদি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে হাজার হাজার মানুষ।  

ঢাকার কাওরানবাজার এলাকার কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমির হোসেন বেনারকে বলেন, “লক ডাউনে কোনো কাজ থাকবে না। তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি। কারণ, গত বছরের মতো দীর্ঘ সময় ছুটি থাকলে কীভাবে চলব?”

বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তিনগুণের বেশি ভাড়া দিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে তিনি সাতক্ষীরা যাচ্ছেন বলে জানান।  

মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ফেরিঘাটের বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এখনই কিন্তু লক ডাউন চলছে। এর মধ্যেও এত যাত্রী আসছে যে, চাপ সামলানো যাচ্ছে না।

একটি মিনি ট্রাকে পুরো সংসার গুছিয়ে নিয়ে কিশোরগঞ্জে নিজ গ্রামে ফিরছিলেন শাহদাত হোসেন ও রওশন আরা দম্পতি। বুধবার সন্ধ্যায় তাঁরা বেনারকে জানান, “লক ডাউন আসলে কতদিন থাকবে জানি না। তাই ঢাকার বাসা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। এতে বাসা ভাড়াটা বাঁচবে। পরিস্থিতি ভালো হলে ঈদের পরে আবার ফিরব। 

বুধবার থেকে রোজা

মঙ্গলবার বাংলাদেশের আকাশে রমজান মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় বুধবার থেকে রোজা শুরু হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা শেষে এ ঘোষণা দেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান।  

এর আগে সোমবার ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সর্বোচ্চ ২০ জন মুসল্লি এবং রমজানে তারাবির নামাজে খতিব, ইমাম, হাফেজ, মুয়াজ্জিন ও খাদিমসহ সর্বোচ্চ ২০ জন মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন। ১৪ এপ্রিল থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম বলবত থাকবে। 

মাদ্রাসা বন্ধ রাখছে হেফাজত

লকডাউন চলাকালে সারাদেশে কওমি মাদ্রাসা খোলা রাখতে চেয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। তবে সরকারের নির্দেশে সেই অবস্থান থেকে সরে গেছে।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক ও মুখপাত্র জাকারিয়া নোমান মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “আমরা সরকারের নির্দেশে আমাদের (হাটহাজারী) মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছি। শুধু অল্প সংখ্যক হেফজ বিভাগের ছাত্ররা মাদ্রাসায় আছে। এ ছাড়া, সারা দেশের সব কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

১৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করা হবে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পর ১১ এপ্রিল হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভাশেষে দেয়া বিবৃতিতে জানান হয়, করোনার অজুহাতে দেশের ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করার ষড়যন্ত্র দেশের তৌহিদি জনতা মেনে নেবে না।

হেফাজতের এই বিবৃতির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, “আমরা সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবো। কেউ মাদ্রাসা খোলা রাখতে পারবে নাএটিই আমাদের সিদ্ধান্ত।

এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সকল মাদ্রাসা বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়। 

lockdown2.JPG
করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় লকডাউন ঘোষণার পাশাপাশি গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়ায় মোটরসাইকেলে করে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তিনজন। ছবিটি যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে তোলা। ১৩ এপ্রিল ২০২১। [বেনারনিউজ]

আতঙ্কিত না হওয়ার আহবান প্রধানমন্ত্রীর

জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “গত সপ্তাহে দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকার ধারণ করলে মানুষের চলাচলের ওপর কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়। আপনারা দেখেছেন, কোনোভাবেই সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাই আমাদের আরো কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সরকার সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর আমি দরিদ্র-নিম্নবিত্ত মানুষদের সহায়তার জন্য কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে পল্লী অঞ্চলে কর্মসৃজনের জন্য ৮০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং পবিত্র রমজান ও আসছে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৬৭২ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪২ হাজার নিম্নবিত্ত পরিবার উপকৃত হবে,” বলেন শেখ হাসিনা।

ইতোমধ্যে দেশে ৫৬ লাখের বেশি মানুষকে করোনা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথম ডোজ গ্রহণকারীদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে।

আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের সকলকে টিকার আওতায় নিয়ে আসব,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার দেশে করোনাভাইরাসে আরো ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় লাখ, ৯৭ হাজার ৯৮৫ জন, মৃত্যু হয়েছে নয় হাজার ৮৯১ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ২৯ লাখ ৫১ হাজারের বেশি। 

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কামরান রেজা চৌধুরী।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন