Follow us

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে প্রথম কোনো চিকিৎসকের মৃত্যু

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-04-15
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ডা. মঈনের মৃত্যু সংক্রান্ত অনলাইন সংবাদ পড়ছেন ঢাকার একজন পাঠক। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুবরণ করলেন ডা. মঈন। ১৫ এপ্রিল ২০২০।
ডা. মঈনের মৃত্যু সংক্রান্ত অনলাইন সংবাদ পড়ছেন ঢাকার একজন পাঠক। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুবরণ করলেন ডা. মঈন। ১৫ এপ্রিল ২০২০।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোরে মো. মঈন উদ্দিন নামের এক ​চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক নিজ উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকায় এসেও বাঁচতে পারেননি।

প্রয়াত ডা. মঈন সিলেটে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ টিমের সদস্য ছিলেন। দেশের কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিষয়ক নিয়মিত অনলাইন বুলেটিনে বুধবার তাঁকে “জাতির জন্য জীবন উৎসর্গকারী প্রথম কোভিড যোদ্ধা” আখ্যা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

যদিও তাঁর মৃত্যুর জন্য সরকারের অবহেলাকে দায়ী করে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিশেয়ন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ বেনারকে বলেন, “চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হওয়ার কারণেই তাঁর অবস্থার অবনতি হয়।”

“সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর জন্য সেখানকার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ‘ভেন্টিলেটর’ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় আনতে সরকারের কাছে এয়ার-অ্যাম্বুলেন্স চাওয়ার পরও তা দেওয়া হয়নি,” বলেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, প্রয়াত মঈন সরকার বিরোধী বা ভিন্নমতালম্বী হওয়ার কারণেই অবহেলার শিকার হয়েছেন।

তবে সরকার সমর্থক বলে পরিচিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বেনারকে বলেন, “এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং অনভিপ্রেত অভিযোগ। জাতির এই ক্রান্তিকালে আমরা সব চিকিৎসকেরা পেশাজীবী হিসেবে সব ধরনের রাজনৈতিক চেতনার উর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেবাদান করে চলেছি।”

প্রয়াত মঈনকে “করোনা যুদ্ধের প্রথম শহীদ” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজকে তাঁর মৃত্যুতে সহকর্মীদের হৃদয় ভারাক্রান্ত। এর মানে এই নয় যে, কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে তাঁরা পিছপা হবেন।”

অধ্যাপক ইকবাল আরো বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা তাঁর অধীনস্থ যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাঁদের সাথে আমরা কথা বলেছি। স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছি।”

“যে কোনো পরিস্থিতিতে পাশে থাকবেন—এই নিশ্চয়তাটুকু প্রদান করে সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত চিকিৎসকদের তা জানানো,” বলেন তিনি।

নিয়মিত বুলেটিনে বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ডা. আজাদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ পুরো সরকার দেশের সকল চিকিৎসক, নার্সদের পাশে রয়েছে।”

উল্লেখ্য, সোমবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যেসব সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে করোনাভাইরাস রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন তাঁদের বিশেষ সম্মানী দেওয়া হবে। এ জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।”

প্রধানমন্ত্রী জানান, তাঁদের স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমা বাবদ ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে। দায়িত্ব পালনকালে যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাহলে পদমর্যদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবিমা, যা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে।

প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দেওয়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে প্রথম মারা গেলেন ডা. মঈন।

ডা. মঈনের পাশে থাকার উদাহরণ দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুসরণ করে পরিপূর্ণ জীবাণুমুক্ত অবস্থায় তাঁর মৃতদেহ পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর দাফনের ব্যবস্থাপনাও আমাদের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। মরহুমের পরিবারের যেসব সদস্য ঢাকায় তাঁর সাথে ছিলেন, তাঁদেরও বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

প্রসঙ্গত, ৫ এপ্রিল ডা. মঈনের দেহে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। দুই দিনের মাথায় শ্বাসকষ্ট শুরু হলে সিলেটে ‘ভেন্টিলেটর’ না পেয়ে ৮ এপ্রিল তিনি ঢাকায় আসেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সোমবার থেকে তিনি ‘লাইফ সাপোর্টে’ ছিলেন।

বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) মুখপাত্র ডা. নিরুপম দাস বেনারকে বলেন, “চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর মনোবল ঠিক রাখার জন্য বিডিএফ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কেউ আক্রান্ত হলে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তাঁর সমস্ত দায়িত্ব তারা নেবে। প্রয়োজনে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে তাঁদের ঢাকায় আনারও ব্যবস্থা করবে,” জানান নিরুপম দাস।

তিনি জানান, চিকিৎ​সকদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউসহ আলাদা একটি হাসপাতাল প্রস্তুত করারও চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন এক লাখের ওপরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত রয়েছেন ২৫ হাজার ৬১৫ জন চিকিৎসক।

অরক্ষিত চিকিৎসকেরা

সরকার যথা সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণেই করোনা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে ড্যাব সভাপতি বলেন, “এখন এটাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দিতে হবে।”

“ড্যাব বিবৃতি দিয়ে এবং সাংবাদিক সম্মেলন ও ফেসবুক লাইভ করে বারবার একই কথা বলেছে, যারা কোভিডের চিকিৎসা করছেন তাঁদের বাঁচাতে চাইলে মানসম্মত পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) দিতে হবে। এ ক্ষেত্রেও সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে,” বলেন তিনি।

স্বাচিপ সভাপতি ডা. ইকবালও বলেন, “ডাক্তার, নার্স বা সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ানদের মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পিপিই সরবরাহ করা হয়নি। এটা সরবরাহ করা খুবই জরুরি।”

বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সরকার মোট ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৬১৬টি পিপিই সংগ্রহ করতে পেরেছে। যার মধ্যে নয় লাখ ৫৮ হাজার ২৯৪টি ইতিমধ্যে বিলি করা হয়েছে।

এদিকে বিশ্বের কিছু দেশে ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন, মন্তব্য করে মহামারির শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস গত শুক্রবার বলেছেন, “স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন ঝুঁকিতে থাকেন, আমরা সবাই তখন ঝুঁকিতে।”

সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখের বেশি

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা এখন ৫০, আর মোট সুস্থ হয়েছেন ৪৯ জন রোগী। বিগত ২৪ ঘণ্টায় ডা. মঈনসহ মোট চারজন মারা গেছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, এই সময়ে আরও ২১৯ জন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। ফলে দেশে এ নিয়ে মোট শনাক্ত হলেন এক হাজার ২৩১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, বুধবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২০ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন