Follow us

বাম্পার ফলন হলেও ধান কাটতে শ্রমিক সংকট, দুশ্চিন্তায় কৃষক

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-04-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মুখোশ পরে সিলেটের পুকুরিয়া হাওরে ধান কাটছেন কৃষকেরা। ১৩ এপ্রিল ২০২০।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মুখোশ পরে সিলেটের পুকুরিয়া হাওরে ধান কাটছেন কৃষকেরা। ১৩ এপ্রিল ২০২০।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ ছুটিতে বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। হাওর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধান কাটতে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এবার বাম্পার ফলন হলেও অন্য জেলা থেকে ধানকাটা শ্রমিকেরা আসতে না পারায় ফসল ঘরে তোলা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় জনসমাগম এড়াতে গত ২৬ মার্চ থেকে চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ বুধবার আরো দশ দিন বাড়িয়ে ৫ মে পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করেছে সরকার।

এদিকে এপ্রিলের ২৪–২৫ তারিখের দিকে হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল নামতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বুধবার বেনারকে বলেন, “এই ফ্ল্যাশ ফ্লাড তিন থেকে চারদিন থাকতে পারে। সঙ্গে বৃষ্টিও থাকতে পারে। ফলে বোরো ধানের ক্ষতি হতে পারে।”

এই অবস্থায় যেকোনোভাবেই বোরো ধান কাটা শেষ করার জন্য কৃষকদের সহায়তা করতে হাওরাঞ্চলের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বুধবার এক আদেশ জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।

গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে নতুন করে ৩৯০ জন করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে বুধবারের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে এই সময়ে মারা গেছেন ১০ জন।

সরকারি তথ্যমতে, করোনাভাইরাসে বুধবার পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৭৭২ এবং মারা গেছেন ১২০ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, সারা বিশ্বে বুধবার পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ লাখ ২২ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন এক লাখ ৮২ হাজারের বেশি।

‘শ্রমিকরা না আসলে ধান মাঠে পড়ে থাকবে’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে দেশে প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ মেট্রিকটন চাল উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বোরো প্রায় ‍দুই কোটি মেট্রিক টন। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি বোরো।

হাওরাঞ্চলে সারা বছর বোরো ছাড়া আর কোনো ফসল হয় না। বোরো ধান কাটার পর জুন মাসের মধ্যেই হাওর পানিতে পূর্ণ হয়ে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সরেজমিন বিভাগের পরিচালক ড. আলহাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে এ বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই কোটি মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন আসবে হাওরের সাত জেলা থেকে। অর্থাৎ হাওরাঞ্চল আমাদের মোট বোরো উৎপাদনের শতকরা ২০ ভাগ সরবরাহ করে থাকে।”

সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলে জানিয়ে তিনি বলেন, “তবে এ বছর মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। কারণ, হাওরের পানি দেরিতে নেমেছে। আর তার সাথে রয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে শ্রমিক সংকট।”

আলহাজ উদ্দিন বলেন, “আমরা এবার আশঙ্কার মধ্যে আছি। কারণ এবার পাহাড়ি ঢলের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি পাহাড়ি ঢল বেশি হয় তাহলে আমাদের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার কৃষক আব্দুস সামাদ বেনারকে বলেন, “প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক এসে আমাদের ধান কাটে। আমাদের নিজেদের ধান কাটার মতো প্রয়োজনীয় শ্রমিক এখানে নেই। বাইরের শ্রমিকরা না আসলে ধান মাঠে পড়ে থাকবে।”

“এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে বাইরের শ্রমিক আসছে না,” জানিয়ে তিনি বলেন, “এর মধ্যে শুনছি ঢল নামবে। তাহলে সারা বছরের ফসল শেষ হয়ে যাবে।”

সামাদ বলেন, “ফসল কাটার জন্য শ্রমিকদের এখনই আসার ব্যবস্থা করুক সরকার। নাহলে আমাদের পথে বসতে হবে। সারা বছর কী খাব?”

সামাজিক দূরত্ব রেখে সহায়তা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতিদিন একজন মানুষ গড়ে ৪০০ গ্রাম চাল খান। হাওরাঞ্চলে বোরো ধানে ক্ষতি হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবীদেরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “বোরো আমাদের প্রধান ধান। দেশে উৎপাদিত মোট ধানের একটি বড় অংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে তা হবে আমাদের জন্য অশনি সংকেত।”

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ হতে পারে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও চাল কেনা সম্ভব হবে না।”

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের মতো সারাবিশ্বে ক্ষুধা মহামারি হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ খাদ্য কর্মসূচি। মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনলাইন ব্রিফিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড ব্যাশলি এই হুঁশিয়ারি জানান।

“কোভিড-১৯ মোকাবেলা করার পাশাপাশি আমরা ক্ষুধা মহামারির প্রান্তে চলে এসেছি,” মন্তব্য করে ব্যাশলি বলেন, “আমরা কেবলমাত্র বৈশ্বিক স্বাস্থ্য মহামারির মুখোমুখি নই। আমরা বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে।”

“সেকারণে যেভাবেই হোক হাওরের বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। প্রথমত শ্রমিকদের চলাচল উন্মুক্ত করতে হবে। সম্ভব হলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে থাকা হার্ভেস্টর দিয়ে ফ্ল্যাশ ফ্লাড শুরুর আগেই দ্রুত বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা করতে হবে,” বলেন বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই যাতে দেশে খাদ্য ঘাটতি না হয় সেদিকে নজর রাখতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক মঙ্গলবার নেত্রকোনার মদন উপজেলার হাওরাঞ্চলে ধানকাটা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও খাদ্যের যোগান ঠিক রাখার জন্য সরকার হাওরের ফসল ঘরে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, “সেকারণে ফসল কাটার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে সব শ্রমিক হাওরে আসতেন, সামাজিক দূরত্ব মেনে হাওরে তাঁদের আসার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”

চলতি বছর ফসল ভালো হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “সরকার আট লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে।”

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হবে বলে জানান মন্ত্রী। এর আগে ১১ মার্চ তিনি জানিয়েছিলেন, কৃষক অ্যাপ ব্যবহার করে বোরো মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনবে সরকার।

এদিকে “প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে” শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের ধান কাটতে অংশ নেওয়ার জন্য মঙ্গলবার আদেশ জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।

“করোনাভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাবজনিত বৈশ্বিক মহামারির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে,” মন্তব্য করে এতে বলা হয়, “দেশের যেসব অঞ্চলে বোরো ধান আহরণের ক্ষেত্রে কৃষকদের সহায়তা করা প্রয়োজন, সেসব এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কৃষকদের প্রয়োজনীয় সাহায্য করার অনুরোধ করা হলো।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন