Follow us

বিদেশে করোনাভাইরাসে তিন শতাধিক বাংলাদেশির মৃত্যু

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-04-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশি ফটো সাংবাদিক এ হাই স্বপনকে নিউ জার্সির একটি গোরস্তানে দাফন করা হচ্ছে। ৩০ মার্চ ২০২০।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশি ফটো সাংবাদিক এ হাই স্বপনকে নিউ জার্সির একটি গোরস্তানে দাফন করা হচ্ছে। ৩০ মার্চ ২০২০।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৩টি দেশে অন্তত ৩৭০ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের ভেতরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রায় তিন গুণ।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক। একই সময়ে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৮৬ জন।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ৩০০শ’র বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে মারা গেছেন বলে বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ামিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বলেন মন্ত্রী জাহিদ মালেক।

দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি মারা গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে বুধবার পর্যন্ত ১৮০ জন বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন বলে বেনারকে জানান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার শামীম আহমদ।

তিনি বলেন, “স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে ১৮০ জন বাংলাদেশি কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।”

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি তাসলিমা ইসলাম বেনারকে বলেন, “আমার পরিবারও করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত। তিন সপ্তাহ আগে নিউইয়র্কে বসবারত আমার বড় বোন, তাঁর স্বামী ও সন্তান এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।”

“আমার বোন ও তাঁর সন্তান এখন ভালো আছেন। তবে তিন সপ্তাহ ধরে আইসিইউতে থাকার পরেও আমার দুলাভাই বাঁচতে পারেননি,” বলেন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করা তাসলিমা।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে ভাইরাসে আক্রান্ত রয়েছেন বলে জানান শামীম আহমদ।

একক দেশ হিসেবে সবচে বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরে। দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাংলাদেশি হাইকমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

বিশ্বে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হন গত ৮ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরেই। তবে এই রোগে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হয়নি বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “সিঙ্গাপুর সরকার কভিড-১৯ আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে আমাদের ধারণা, এখানকার প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।”

বেশিরভাগ বাংলাদেশির মধ্যে হালকা ধরনের কভিড-১৯ এর উপসর্গ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সিঙ্গপপুরে বিপুল সংখ্যক লোকজনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কারণে দেশটিতে বেশি সংখ্যক করোনাভাইরাস আক্রান্ত লোকজন চিহ্নিত হচ্ছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ হাইকমিশনার।

করোনাভাইরাসে দেশের বাইরে মারা গেছেন তিন শতাধিক বাংলাদেশি
করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত দেশের বাইরে মারা গেছেন তিন শতাধিক বাংলাদেশি। ২৩ এপ্রিল ২০২০। বেনারনিউজ

প্রবাসী শ্রমিকদের বেশি মৃত্যু সৌদি আরবে

বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হয় এমন দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি, মোট ৩১ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তি সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বেনারকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশি মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। তবে আমরা কর্মী পাঠাই এমন দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি মারা গেছেন সৌদি আরবে। সেখানে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩১ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন।”

তবে মোট কত বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সেটা সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়নি জানিয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বেনারকে বলেন, “তবে আমরা জানার চেষ্টা করছি।”

বাংলাদেশ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মুনিরুছ সালেহীন বলেন, “সংশ্লিষ্ট দেশগুলোই আক্রান্ত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা দিচ্ছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো বৈষম্য দেখা যায়নি। তবে যেসব দেশে আমাদের শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন, তাঁদের জন্য বাংলাদেশ সরকার সহায়তা পাঠাচ্ছে।”

“২২টি দেশে প্রায় ৫ কোটি টাকা পাঠিয়েছি। আরো কিছু চাহিদা আছে। সেটা কীভাবে পাঠানো যায়, তা নিয়ে বৈঠকে বসব আমরা,” বলেন তিনি।

“বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত বাংলাদেশির লাশ সৌদিতেই দাফন করা হবে,” জানিয়ে রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, “সৌদি কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবেই মরদেহ সৎকার করে থাকে।”

অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ১৪০ জন, ইতালিতে ৭ জন, কানাডায় ৬ জন, স্পেনে ৫ জন, কাতারে ৪ জন ও সুইডেনে ২ জন বাংলাদেশি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশি কমিউনিটির তথ্য থেকে।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কেনিয়া, লিবিয়া ও গাম্বিয়ায় ১ জন করে বাংলাদেশি মারা গেছেন।

এসব দেশে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত বাংলাদেশির সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে এই সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো।

ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান শিকদার বেনারকে বলেন, “কভিড-১৯ এ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ইতালি অন্যতম দেশ হলেও এখন পর্যন্ত এখানে সাত বাংলাদেশি মারা গেছেন এবং ৭৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছি।”

কাতারে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চারজন বাংলাদেশি মারা গেছেন জানিয়ে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসুদ আহমেদ বেনারকে বলেন, “বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত কাতারে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি করোনভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।”

প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঝুঁকি

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “যেসব দেশে আমরা শ্রমিক পাঠাই সেসব দেশে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। যেমন সৌদি আরবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃতের এক তৃতীয়াংশের বেশি বাংলাদেশি। আবার সিঙ্গাপুরেও আক্রান্তের বড় অংশ বাংলাদেশি শ্রমিকরা।”

“এর অন্যতম বড় কারণ তাঁরা নোংরা পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস করেন, যেখানে একটি টয়লেট অনেকে মিলে ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ বহু বছর ধরে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বসবাস করে আসছেন, সেটারই ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

“যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে অনেক বাংলাদেশি মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনে বলেন, “ওখানকার কমিউনিটি থেকে জানতে পেরেছি, শুরুতে সেখানকার বাংলাদেশিরা লক ডাউন বা ঘরে থাকার নিয়ম মেনে চলেননি। যার ফলে এত বাংলাদেশির মৃত্যু দেখতে হলো। উন্নত দেশে এত মানুষের মৃত্যু সত্যি দুঃখজনক।”

“এসব দেশে বহু আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, যারা ভাবছেন চিকিৎসা নিতে গেলে হয়তো দেশে ফেরত পাঠাবে,” মন্তব্য করে শরিফুল হাসান বলেন, “এসব ভয় থেকেও তাঁরা চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন না।”

“বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকেও কমিউনিটির খোঁজ নিতে হবে। আক্রান্ত বাংলাদেশিদের থেকে অন্যান্যদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে,” মনে করেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে যেসব বাংলাদেশি বসবাস করেন, তাঁদের বড় একটি অংশ সেখানকার নাগরিক। ফলে তাঁদের জন্য বাংলাদেশের খুব বেশি কিছু করার নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নতুন আক্রান্ত ৪১৪, মৃত্যু সাত

গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে নতুন করে ৪১৪ জন করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে বৃহস্পতিবারের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে এই সময়ে মারা গেছেন ৭ জন।

সরকারি তথ্যমতে, করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন চার হাজার ১৮৬ এবং মারা গেছেন ১২৭ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, সারা বিশ্বে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ লাখ ৮২ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন এক লাখ ৮৭ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন