Follow us

বাংলাদেশ ও ভারতে রোজা: বাড়িতেই পড়তে হবে তারাবি, ইফতার পার্টি নিষিদ্ধ

কামরান রেজা চৌধুরী ও পরিতোষ পাল
ঢাকা ও কলকাতা
2020-04-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রমজান শুরুর আগের দিন ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পোশাক পরে ঢাকায় বাসার বারান্দা থেকে রাস্তায় উঁকি দিয়ে দেখছে করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দী এক শিশু। ২৪ এপ্রিল ২০২০।
রমজান শুরুর আগের দিন ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পোশাক পরে ঢাকায় বাসার বারান্দা থেকে রাস্তায় উঁকি দিয়ে দেখছে করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দী এক শিশু। ২৪ এপ্রিল ২০২০।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকির কারণে রমজান মাসের ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশে তারাবির নামাজ ঘরে বসে পড়তে হবে। ঘটা করে ইফতার পার্টি আয়োজন করা চলবে না।

শুক্রবার বাংলাদেশে একদিনে সর্বোচ্চসংখ্যক ৫০৩ জন নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন আরও চারজন। এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার সকালে রমজান উপলক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা শেষে ধর্ম সচিব নুরুল ইসলাম সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখা গেছে। তাই, শনিবার থেকে রোজা শুরু হচ্ছে। আগামী ২০ মে লাইলাতুল কদর অনুষ্ঠিত হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের শুক্রবার দেয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানে এশা ও তারাবি’র নামাজের জামায়াতে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদিম এবং দুইজন হাফেজসহ সর্বোচ্চ ১২ জন অংশ নিতে পারবেন। অন্যান্য মুসল্লিরা নিজ নিজ ঘরে এশা ও তারাবি নামাজ আদায় করবেন।”

এর আগে দৈনিক পাঁচবেলার নামাজে পাঁচজন এবং জুমার নামাজে দশজন অংশ নিতে পারবেন বলে গত ৬ এপ্রিল সরকারি নির্দেশে জানানো হয়েছিল।

এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে এবার কেউ ইফতার অনুষ্ঠান আয়োজন বা অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারবেন না জানিয়ে শুক্রবারের নিদের্শনায় বলা হয়, নির্দেশ লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন খারাপ ইমামদের

নওগাঁ শহরের গোডাউন জামে মসজিদের ইমাম আহমেদুল হক বেনারকে বলেন, “আসলে আমি বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে পারছি। তবে ফাঁকা মসজিদ একজন ইমাম মানতে পারবেন না। তাই মন খুব খারাপ। এ বছর মসজিদে তারাবি নামাজ পড়া হবে না।”

তিনি বলেন, “যাঁরা সারা বছর নামাজ পড়েন না, তাঁরাও রমজানে নিয়মিত মসজিদে আসেন। অনেকেই নামাজের দোয়া-দরূদ জানেন না। এখন বাসায় তাঁরা তারাবি নামাজ পড়তে পারবেন না।”

প্রতি বছর রোজা উপলক্ষে মসজিদ কর্তৃপক্ষ হাফেজ ছাড়াও ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করে থাকে। জনগণ উদারভাবে মসজিদে দান করেন জানিয়ে আহমেদুল হক বলেন, “এ বছর এগুলো হবে না। এতে অর্থনৈতিকভাবে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”

এছাড়া রমজান মাসে অনেকেই মসজিদে ইফতারের জন্য ভালো মানের খাবার পাঠান জানিয়ে আহমেদুল হক বলেন, “গরিব ও দুস্থ মানুষেরা পুরো মাস মসজিদ থেকে ভালো ভালো খাবার পেয়ে থাকে। তাই, মসজিদ বন্ধ থাকায় দরিদ্র মানুষগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় সাধারণ ছুটি চলাকালে ক্রেতার অপেক্ষায় ঢাকার ইফাতরি বাজারের বিক্রেতারা। ২৩ এপ্রিল ২০২০। [মেঘ মনির/বেনারনিউজ]
করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় সাধারণ ছুটি চলাকালে ক্রেতার অপেক্ষায় ঢাকার ইফাতরি বাজারের বিক্রেতারা। ২৩ এপ্রিল ২০২০। [মেঘ মনির/বেনারনিউজ]
ব্যবসা–বাণিজ্যে মন্দা

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, প্রতি বছর রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসার প্রসার ঘটে।

একটি পরিবার সারা বছর প্রতিমাসে যে পরিমাণ ব্যয় করেন রমজানে তার চেয়ে শতকরা ৩০ ভাগ বেশি ব্যয় করেন জানিয়ে তিনি বলেন, “অভ্যন্তরীণ চাহিদাও অনেক বৃদ্ধি পায়। এবার হয়তো ভোগ্যপণ্য ছাড়া ব্যবসা ভালো হবে না।”

সারা বছর গড়ে প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, রোজাকে কেন্দ্র করে তার কমপক্ষে ২৫ ভাগ বেশি বিক্রি হয় বলে বেনারকে জানান মিরপুরের মুদি দোকানি সুবল সাহা।

এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হলেও বিক্রি কমেনি বলে জানান সুবল।

“যেহেতু মানুষ সশরীরে দোকানে আসতে পারছে না সেহেতু আমি বাড়ি বাড়ি পণ্য সরবরাহ করছি,” জানিয়ে সুবল বলেন, “করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা কমেনি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।”

অভাব–অনটন বাড়বে

ভোগ্যপণ্য দোকনিদের ব্যবসা বৃদ্ধি পেলেও অভাব–অনটনের মধ্যেই রোজা শুরু করতে যাচ্ছে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, পরিবহন শ্রমিক ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আয় নেই বললেই চলে।

গাইবান্ধার ফিরোজা বেগম ঢাকার মিরপুর দুয়ারিপাড়ার বস্তিতে বসবাস করেন। মিরপুরের বিভিন্ন বাসায় কাজ করে জীবনযাপন করেন। তাঁর মেয়ে তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। করোনাভাইরাসের কারণে বাসা–বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। আর কারখানা বন্ধ থাকায় মেয়েও বেতন পাননি।

ফিরোজা বেগম বেনারকে বলেন, “এক মাসের বেশি হলো বাড়িওয়ালা কাজে যেতে দেয় না। মেয়েও গত মাসের বেতন পায়নি। বাড়িতে বসে না খেয়ে দিন কাটাই। সরকারি ত্রাণ পেতে মারামারি করতে হয়। কীভাবে রোজা রাখব, জানি না।”

তৈরি পোশাক কর্মী মর্জিনা বেগম বেনারকে বলেন, “আমি মার্চ মাসের বেতন এখনও পাইনি। ফ্যাক্টরি বন্ধ। এই বছর রোজা আমার জীবনে সবচেয়ে খারাপ হবে। বোনাস দূরে থাক, বেতন ছাড়া থাকতে হবে। তারপরও চিন্তা চাকরি থাকে কি না!”

ভারতেও বাড়িতে নামাজ ও ইফতার

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে রোজা শুরুর আগে নির্দেশিকা জারি করেছে সর্বভারতীয় ইমাম-মুয়াজ্জিম কল্যাণ সমিতি।

সমিতির সভাপতি ও কলকাতার সর্ববৃহৎ নাখোদা মসজিদের ইমাম শফিক কাসমি শুক্রবার বেনারকে বলেন, “সকলকে নিজের বাড়িতেই নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ আদায় করতে হবে।”

তিনি বলেন, “মসজিদে গিয়ে নমাজ আদায় করার তো প্রশ্নই নেই, এমনকি বাড়িতে বেশি জায়গা থাকলেও প্রতিবেশীদের ডেকে নামাজ আদায় করা যাবে না।”

বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবিশেষের পক্ষ থেকে রমজান মাসে ইফতার পার্টির যে আয়োজন করা হয়ে থাকে, তা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে জানিয়ে প্রত্যেককে ইফতারও নিজের বাড়িতে করার আবেদন জানান তিনি।

“বর্তমান পরিস্থিতি বিলাসিতা করার নয়, বরং জীবন বাঁচানোটা খুব জরুরি। তাই রমজান মাসে সবাই বাড়িতে নামাজ আদায় করবেন এবং ইফতারও করবেন বাড়িতেই,” বেনারকে বলেন বেঙ্গল ইমাম অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মহম্মদ ইয়াহিয়া।

এদিকে রাজ্যের মুসলিমদের রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরে থেকেই প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ৬৮৯ জন, মারা গেছেন ১৩১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, শুক্রবার পর্যন্ত ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৪৩৪ জন, মারা গেছেন ৭৮০ জন। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৭ লাখ ৯০ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন এক লাখ ৯৫ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন