সচিব জানালেন, দুই দেশের ‘সম্পর্ক খারাপ হবে’ এমন কিছু বোঝাতে চাননি চীনা রাষ্ট্রদূত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-05-12
Share
সচিব জানালেন, দুই দেশের ‘সম্পর্ক খারাপ হবে’ এমন কিছু বোঝাতে চাননি চীনা রাষ্ট্রদূত ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন (ডানে) ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের (মাঝখানে) কাছে চীনের উপহার হিসেবে পাওয়া পাঁচ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা হস্তান্তর করেন বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। ১২ মে ২০২১।
[সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ নৌ চলাচল সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন বক্তব্যে ঢাকার প্রতিক্রিয়ার পর বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হবে এমনটি তিনি বোঝাতে চাননি বলে বেনারকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে বৈঠকে ঢাকাস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বেনারকে বলেন, “রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, প্রসঙ্গ বহির্ভূতভাবে বিষয়টি উঠে আসে।” 

এর আগে চীনের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া সিনোফার্মের তৈরি করোনাভাইরাসের পাঁচ লাখ ডোজ টিকা বুধবার সকালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজে ঢাকায় পৌঁছায়। 

পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের হাতে টিকাগুলো তুলে দেন চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। 

এরপর পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনা রাষ্ট্রদূত। এ সময় অন্যান্য আলোচনার পাশাপাশি চীনা রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়টিও উঠে আসে। রাষ্ট্রদূতের ইংরেজি ভাষাগত দুর্বলতা আছে বলেও উল্লেখ করেন মাসুদ বিন মোমেন।

“চীনের রাষ্ট্রদূত যে কথা বলেছিলেন সেটা কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়,” মন্তব্য করে এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “তবে তিনি যদি নমনীয় হয়ে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করে থাকেন, সেটা কূটনীতির জন্য ইতিবাচক।” 

উল্লেখ্য, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ নৌ চলাচল সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার দেশীয় জোট কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘যথেষ্ট খারাপ’ করবে বলে গত সোমবার এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। 

রাষ্ট্রদূতের এমন বক্তব্যে অসন্তুষ্ট হয় বাংলাদেশ। দেশটির এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় উল্লেখ করে মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, “বাংলাদেশ একটি স্বাধীন–সার্বভৌম দেশ। আমরাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করব।” 

কোয়াডে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ কোনো আমন্ত্রণ পায়নি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোয়াড নিয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত আগ বাড়িয়ে কথা বলছেন।

বুধবারের অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আশা করি সামনের দিনে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকেই এগোবে।”

এদিকে কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে নিয়মিত ব্রিফিং-এ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস।

বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে কোয়াড প্রসঙ্গে চীনের বক্তব্য সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রাইস বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করি এবং আমরা পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাংলাদেশের অধিকারকে সম্মান করি।”

তিনি বলেন, “ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে সমন্বয় সাধন করতে কোয়াড গঠিত হয়েছে, মৌলিকভাবে আমাদের লক্ষ‍্য মুক্ত ও স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গঠনে সামনে এগিয়ে যাওয়া।” 

কোয়াড একটি “অনানুষ্ঠানিক, অপরিহার্য ও বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়া যার মূল কথা সমজাতীয় গণতন্ত্রীদের আহ্বান করা—যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান এখন কোয়াডের সদস্য,” বলেও জানান পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই মুখপত্র। 

সিনোফার্মের টিকা যৌথ উৎপাদনের প্রস্তাব

টিকা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপহারের জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় চীনের সিনোফার্মের টিকা যৌথভাবে উৎপাদনের প্রস্তাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। 

তিনি বলেন, “আমাদের খুব ভালো ভালো ওষুধ কোম্পানি রয়েছে। কাঁচামাল এনে আমরা এখানে যৌথভাবে উৎপাদন করতে পারি, যা উভয় দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।” 

তবে এ বিষয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

বাংলাদেশে পৌঁছানো সিনোফার্মের টিকাটি চীনে এখন পর্যন্ত ১০ কোটির বেশি মানুষ নিয়েছেন, এছাড়া চীন টিকাটি বিশ্বের ৬০টি দেশে রপ্তানি করছে কিন্তু “সৌভাগ্যক্রমে তাঁদের কোনো খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি,” জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এর ফলে বাংলাদেশ এই টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।” 

গত ২৯ এপ্রিল চীনা কোম্পানি সিনোফার্মের টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ। এছাড়া গত ৭ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) এ টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। 

গত বছর বাংলাদেশে করোনাভাইরাস টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনা করতে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ও আনহুই জিফেই আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত সেই ট্রায়ালগুলো হয়নি। 

পরবর্তীতে ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য-সুইডেন উদ্ভাবিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকার তিন কোটি ডোজ কেনার চুক্তি করে সরকার। কিন্তু ভারতে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ৭০ লাখ টিকা সরবরাহের পর দেশটি টিকা রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।

এর বাইরে ভারত থেকে উপহার হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৩ লাখ ডোজ টিকা। 

গত ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশে শুরু হয় গণটিকাদান কর্মসূচি। তবে সময়মতো ভারত থেকে টিকার চালান না আসায় নতুনদের টিকাদান বন্ধ করে শুধু প্রথম ডোজ নেয়া লোকজনকে বর্তমানে টিকাটির দ্বিতীয় ডোজ দিচ্ছে সরকার। 

এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিয়েছেন টিকাটির প্রথম ডোজ। প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে কোর্স শেষ করেছেন। তবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার নতুন চালান না আসলে ১৩ লাখের বেশি মানুষের দ্বিতীয় ডোজ টিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। 

এই পরিস্থিতিতে, এপ্রিলে রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এবং চীনের সিনোফার্মের টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় সরকার। 

তবে প্রথম ডোজ হিসেবে যারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছেন তাঁদেরকে দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া যাবে কি না সে বিষয়ে নির্দিষ্ট গবেষণা না থাকায় চীনের উপহারগুলো নতুন গ্রহীতাদেরকেই দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। 

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানানো হয়, চীন থেকে আসা পাঁচ লাখ টিকা মেডিকেল শিক্ষার্থী, নার্সিং শিক্ষার্থী এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দেওয়া হবে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সাত লাখ, ৭৭ হাজার ৩৯৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার ৪৫ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ কোটি ৯৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ৩৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন