Follow us

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, সরিয়ে নেয়া হচ্ছে ২২ লাখ মানুষ

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2020-05-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ মহড়া। ১৮ মে ২০২০।
ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ মহড়া। ১৮ মে ২০২০।
[সৌজন্যে: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী]

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ২২ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে সরকার। মঙ্গলবার রাতের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছেছেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ সাতক্ষীরা-খুলনা হয়ে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানতে পারে বলে বেনারকে জানান আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ থাকতে পারে ঘণ্টায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে আম্ফানের তাণ্ডব বাংলাদেশের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। আর আশ্রয়কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা না গেলে সেখান থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে আম্ফান মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি “অন্য সময়ের চেয়ে বেশি,” বলে বেনারকে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান।

তিনি বলেন, “আমরা ঘুর্ণিঝড় ফনির সময় ১৮ লাখ মানুষকে সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো সাইক্লোন সেন্টারে নিয়েছিলাম। এবার আমরা প্রায় ২২ লাখ মানুষকে তাঁদের বাড়িঘর থেকে সাইক্লোন সেন্টারে নেব। ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ উপকূলীয় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছি।”

প্রসঙ্গত, ঘূর্ণিঝড় ফনি ২০১৯ সালের মে মাসে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে আঘাত হানে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আশ্রয়কেন্দ্রে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা

করোনাভাইরাস মহামারি রোধের অংশ হিসেবে এবার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান।

তিনি বলেন, “এবার ২২ লাখ মানুষের জন্য ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।”

আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ভবনকে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষজনকে সাইক্লোন সেন্টারে নেয়ার সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ১০ ধরনের শুকনা খাবার, পানি, সাবান, মাস্ক, শিশু খাদ্য, গবাদিপশুর খাদ্য ইত্যাদি নিশ্চিত করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত আম্ফান যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে খুলনা, বরিশাল ‍ও নোয়াখালী অঞ্চল বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে মনে হচ্ছে।”

“তবে, আমরা বসে নেই। উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গাদের জন্য সাইক্লোন সেন্টার আছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ বেসরকারি সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি যাতে রোহিঙ্গারা আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়,” বলেন প্রতিমন্ত্রী।

আম্ফান মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি অনেক ভালো এবং দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে বলে মন্তব্য করলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আব্দুল লতিফের মতে, “আশ্রয়কেন্দ্রে যখন মানুষ দলে দলে প্রবেশ করবে তখন সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

“ঝড় যখন আঘাত হানবে তখন মানুষ একত্রিত হয়ে থাকার চেষ্টা করবে; দূরে যাবে না। তখন করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে হবে, এ কথা মাথায় থাকবে না,” বেনারকে বলেন আব্দুল লতিফ।

লতিফ বলেন, “বাংলাদেশে সাইক্লোন নতুন নয়। কিন্তু একইসাথে সাইক্লোন ও মহামারি এমন পরিস্থিতি আমরা দেখিনি। এরা মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।”

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান সাতক্ষীরা-খুলনার পাশাপাশি বরিশাল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ওপর দিয়েও প্রবাহিত হবে বলে বেনারকে জানান আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামুসদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, “বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বরিশাল অঞ্চলের জন্য সাত নম্বর বিপদ সংকেত রয়েছে। বুধবার সকালে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানো হবে। আর কক্সবাজার চট্টগ্রামের জন্য আট নম্বর সংকেত দেয়া হবে।”

“ভাসানচরে আম্ফানের আঘাত বেশি হতে পারে। তবে উখিয়া-টেকনাফে তেমন বেশি হবে না,” বলেন শামুসদ্দিন আহমেদ।

১৯৭০ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলঙ্করী ঘুর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের দেড় লাখ মানুষ প্রাণ হারান। ২০০৭ সালে সিডরের আঘাতে তিন হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারান। ২০১৯ সালে বুলবুল ও ফনি বাংলাদেশে আঘাত করে, তবে প্রাণহাণি ছিল কম।

রোহিঙ্গা শিবিরের প্রস্তুতি

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় দশ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছে ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশান গ্রুপ আইএসসিজি।

আইএসসিজির মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস বেনারকে বলেন, ইতিমধ্যে ক্যাম্পগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলায় নানা প্রস্তুতি এবং সতর্কতামূলক সচেতনতা বাড়ানো হয়েছে।

“এছাড়াও ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতির অবনতি হলে আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহারের জন্য ক্যাম্পের আশ-পাশে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাকা ভবন রয়েছে সেগুলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে,” যোগ করেন সৈকত।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বেনারকে বলেন, এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে যেন লোকজনের ভীড় কম থাকে সেজন্য আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত রাখার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দুই দফায় ফিরে আসা ৩০০ জনের বেশি রোহিঙ্গাকে সরকার সম্ভাব্য করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে না নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে পাঠায়।

এই রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত সংঘনিরোধ সময় শেষে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে পাঠানোর অনুরোধ করে গত সপ্তায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লেখেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস।

তবে ভাসনচরে পাঠানো রোহিঙ্গাদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে বেনারকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

এদিকে ভাসানচরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও সেখানে কোনো সমস্যা হবে না বলে বেনারকে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

তিনি বলেন, “সেখানে কমপক্ষে ১২০টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত আছে। ভাসানচরে যে ৩০৫ জন রোহিঙ্গা আছে তাঁদের অথবা তাঁদের সেবা প্রদানকারীদের কোনো অসুবিধা হবে না।”

করোনায় আরও ২১ জনের মৃত্যু

দেশে গত ২৪ ঘন্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ২৫১ জন।

সবমিলিয়ে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৭০ জনের। আর বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর মোট সংখ্যা ২৫ হাজার ২১২।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মঙ্গলবার (১৯ মে) একদিনেই চারজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে।

এনিয়ে গত পাঁচদিনে নয়জন রোহিঙ্গাকে করোনা আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে বেনারকে জানান কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু মোহাম্মদ তোহা।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, সোমবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৮ লাখ ৮১ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন তিন লাখ ২২ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন