Follow us

করোনায় মৃত লাশ থেকে স্বজনরা দূরে, সৎকার করছেন স্বেচ্ছাসেবকরা

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-06-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত এক ব্যক্তির লাশ দাফন করছেন আল-মারকাজুল ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকরা। ২৫ মে ২০২০।
ঢাকায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত এক ব্যক্তির লাশ দাফন করছেন আল-মারকাজুল ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকরা। ২৫ মে ২০২০।
[সৌজন্যে: আল-মারকাজুল ইসলামী]

সংক্রমণের ভয়ে করোনাভাইরাস কিংবা এই রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃতদের কাছে আসছেন না অনেক পরিবার সদস্য, এ অবস্থায় লাশ সৎকারে এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁরা একদিকে যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি বাধাও পাচ্ছেন পদে পদে।

“স্ত্রী-সন্তানের মতো স্বজনরাও দূর থেকে দেখিয়ে দেয়, ওই ঘরে লাশ। শেষ বারের মতো মৃতের মুখটাও আর দেখতে চায় না তারা,” বেনারকে বলেন নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।

ব্যক্তি উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে লাশ সৎকার করতে গিয়ে সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন খোরশেদ। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘টিম খোরশেদ’ বুধবার পর্যন্ত ৭৬টি লাশ দাফন বা সৎকার করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশে করোনায় মৃতদের সৎকারের উদ্যোগ সর্বপ্রথম শুরু করার দাবি করেন তাকওয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা ঢাকার মিরপুরের মাওলানা গাজী ইয়াকুব।

দেশের ৫২ জেলা ও ৭০ উপজেলায় সক্রিয় তাঁর সংগঠন এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় শ লাশ সৎকার করেছে জানিয়ে গাজী ইয়াকুব বেনারকে বলেন, “এলাকাবাসী বা স্বজনরা সহযোগিতা দূরের কথা, বিদায় হওয়া মানুষটির কবর দেওয়ার জায়গাটিও দেখিয়ে দিচ্ছে না। অনেক সময় কাফনের কাপড় আমাদের কিনতে হচ্ছে।”

এদিকে স্বজনরা করোনায় মৃতদের লাশ ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

“করোনার কারণে কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন লাশ ফেলে চলে যায়। ভয়ে আপনজন কেউ থাকছে না। মানুষ ভীত হয়ে এরকম অমানবিক আচরণ করবে, এটাও কিন্তু দুঃখজনক,” বুধবার জাতীয় সংসদে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সেচ্ছাসেবকদের দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা (ডব্লিউএইচও) এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থায় দাফন হওয়া লাশের সংখ্যা সরকার ঘোষিত করোনায় মৃতদের সংখ্যা থেকে বেশি।

তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরও করোনায় মৃতদের মতো দাফন করার কারণে এই সংখ্যা ঘোষিত মৃতের সংখ্যা থেকে বেশি হচ্ছে বলে বেনারকে জানান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. সাইফুল্লাহিল আজম।

কোভিড-১৯ মহামারিতে মৃতদের দাফনের কাজে সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “সরকারিভাবে করোনায় মৃতের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে দাফন হওয়া লাশের সংখ্যা বেশি হলেও পার্থক্যটা বড়জোর ৫০-৬০; এর বেশি নয়।”

গত ১৫ মার্চ কোভিড-১৯ রোগে মৃত ব্যক্তিদের নিরাপদ সৎকারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার। রোগটির উপসর্গ, অর্থাৎ জ্বর, কাশি, সর্দি বা শ্বাসকষ্টে ভুগে কারো মৃত্যু হলে একই নিয়ম মেনে দাফন ও সৎকার করার কথা বলা হয় এতে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭ জনের মৃত্যুতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত করোনায় মোট মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৪৯ জনে গিয়ে ঠেকেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত তিন হাজার ১৮৭ জনসহ দেশে মোট করোনা রোগীর সংখ্যা ৭৮ হাজার ৫২ এবং এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন মোট ১৬ হাজার ৭৪৭ জন বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৭৪ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ১৮ হাজারের বেশি।

সৎকারে জড়িয়ে বিপদে

কাউন্সিলর খোরশেদ জানান, নারায়ণগঞ্জে প্রথম মৃতদেহ সৎকারের সময় জানাজা পড়ানোর জন্য তাঁর সাথে যে হাফেজ ছিলেন, তাঁকে বাড়িওয়ালা নামিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোয় তিনি আর আসেননি। পরবর্তীতে আরেক হাফেজকে সাথে পেয়েছেন তিনি।

“৭০টির বেশি জানাজা পড়ানো এই হাফেজের ওপরও সম্প্রতি এলাকাবাসী চাপ তৈরি করে। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের পুলিশের সহায়তাও নিতে হয়েছে,” বলেন খোরশেদ।

আল-মারকাজুল ইসলামীর দাফন কমিটির প্রধান জুবায়ের হোসাইন বেনারকে বলেন, “আমাদের অধিকাংশ সেচ্ছাসেবী পরিবারকে না জানিয়ে গোপনে কাজ শুরু করেছেন।”

তিনি জানান, তাঁর সংগঠন গত ২৯ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫৮৬টি লাশ সৎকার করেছে।

“এর মধ্যে ৩৫ জন হিন্দু, চারজন খ্রিস্টান এবং একজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী, বাকিরা মুসলমান,” বলেন জুবায়ের হোসাইন।

এদিকে “পরিবারের সম্মতি না থাকায় আগ্রহী অনেকেই সেচ্ছাসেবক হতে পারেনি,” বলে মন্তব্য করেন ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের মৌলভীবাজার জেলার প্রধান ও মাদ্রাসা শিক্ষক এহসানুল হক জাকারিয়া।

তিনি জানান, তাঁর সংগঠন এখন পর্যন্ত চারজনকে দাফন করেছে।

খোরশেদ এবং তার স্ত্রী আফরোজা খন্দকার লুনাসহ তাঁর টিমের মোট পাঁচ জন সদস্য করোনা আক্রান্ত হলেও আল-মারকাজুল ও তাকওয়া ফাউন্ডেশনের দাবি, তাদের কেউ এখনো অসুস্থ হননি।

করোনাভাইরাস বা এর উপসর্গ নিয়ে মৃতদের সৎকারে জড়িত অন্যান্য সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আল মানাহিল করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১৭৮টি লাশ দাফন করেছে বলে বেনারকে জানান সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী ফরিদ উদ্দিন।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ৫৬২ জনকে সৎকার করেছে বলে জানান সংগঠনটির দাফন কার্যক্রমের সমন্বয়ক সালেহ আহমেদ।

তিনি বলেন, “এর মধ্যে ৪৯১ জনকে দাফন এবং ৬৫ জন সনাতন এবং পাঁচজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বীসহ মোট ৭১ জনকে দাহ করা হয়েছে।”

“২৩টি কেন্দ্র দিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছি আমরা,” যোগ করেন তিনি।

তবে লাশ সৎকারের জড়িত সবগুলো সংগঠন অনুমোদিত নয় বলে বেনারকে জানান মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তা সাইফুল্লাহিল আজম।

তিনি জানান, তাঁরা মোট চারটি সংস্থাকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সৎকারের অনুমতি দিয়েছেন। এগুলো হলো- আল-মারকাজুল ইসলামী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, রহমতে আলম সামাজিক সংস্থা এবং আল-রশিদ ফাউন্ডেশন।

এর বাইরে তাকওয়া ফাউন্ডেশন আবেদন করলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্য কেউ আমাদের কাছে কোনো আবেদনই করেনি।”

সরকারের অনুমোদন ছাড়া ওইসব সংগঠনের কোনো বৈধতা নেই মন্তব্য করে সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, ‍“আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ না নিয়েই তারা কী করে কোভিড আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত লাশের কাছে যায়?”

তবে কাউন্সিলর খোরশেদ, মাওলানা ইয়াকুব বা মাদ্রাসা শিক্ষক জাকারিয়ার মতো সেচ্ছাসেবীদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই তাঁরা কাজটি করছেন।

অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কর্মকর্তারাই তাঁদের সহায়তা চাচ্ছেন বলে জানান তাঁরা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন