Follow us

করোনাভাইরাস প্রেক্ষাপট: একমাসে মুক্ত ২০ হাজার বন্দি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-06-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি ও হরকাতুল জিহাদের এক জঙ্গিকে কারাগার থেকে আদালতে নেয়া হচ্ছে। ১১ অক্টোবর ২০১৮।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি ও হরকাতুল জিহাদের এক জঙ্গিকে কারাগার থেকে আদালতে নেয়া হচ্ছে। ১১ অক্টোবর ২০১৮।
[কামরান রেজা চৌধুরী/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে জামিন পেয়ে দেশের সকল কারাগার থেকে এপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছেন ২০ হাজারের বেশি বন্দি।

বন্দির সংখ্যা কমায় দেশের কারাগারগুলোতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা সহজ হবে বলে মনে করছেন কারা কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে এই করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে দাগি আসামি বা জঙ্গিদের বাদ দিয়ে লঘু অপরাধে যারা কারাভোগ করছেন তাঁদের মুক্তি দেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে।

কারা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইতিমধ্যে কমপক্ষে ৪৭ কারারক্ষী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সঙ্গনিরোধে আছেন আরও প্রায় দেড়শ জন কারারক্ষী ও বন্দি। এর আগে করোনাভাইরাসে মারা গেছেন একজন বন্দি।

মঙ্গলবার দেশে করোনাভাইরাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু ও আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাসে ৫৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে করোনাভাইরাসে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়াল এক হাজার ২৬২ জনে।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে তিন হাজার ৮৬২ জন করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলেও জানান নাসিমা সুলতানা। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৪৮১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৮০ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।

ভার্চুয়াল আদালতে জামিন

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত ১১ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালত কাজ শুরু করেছে বলে বেনারকে জানান সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

তিনি বলেন, “গত ২০ কার্যদিবসে সারাদেশে অধস্তন আদালত ভার্চুয়াল শুনানিতে মোট ৬০ হাজার ৩৮৯টি জামিন দরখাস্ত নিষ্পত্তি করে ৩৩ হাজার ১৫৫ জন আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন।”

ভার্চুয়াল আদালত এর বাইরে আরো ৪৮৯ শিশুর জামিন মঞ্জুর করেছে জানিয়ে সাইফুর বলেন, সন্ত্রাস বিরোধী আইনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাঁদের কাউকে জামিন দেয়নি আদালত।

দেশের ৬৮টি কারাগারের মোট ধারণ ক্ষমতা ৪১ হাজার ৩১৪ বলে জানান সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেন, ভার্চুয়াল আদালত শুরুর আগে সারা দেশে মোট বন্দির সংখ্যা ছিল ৯০ হাজারের বেশি।

“ভার্চুয়াল আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্ত হয়েছেন ২০ হাজার ২৩ জন বন্দি। ফলে কারাগারের ওপর চাপ কমেছে। আর কারাগারগুলোতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি কমেছে,” বলেন মঞ্জুর হোসেন।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা মাথায় রেখেই সরকার বন্দির সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বেনারকে জানান কারা মহাপরিদর্শক একেএম মোস্তফা কামাল পাশা।

তিনি বলেন, “এজন্য নির্বাহী আদেশে দুই হাজার আটশ’র বেশি লঘু অপরাধে কারাভোগ করা বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আর এখন ভার্চুয়াল আদালত থেকে অনেকে জামিন পাচ্ছেন।”

“এটি নজিরবিহীন,” বলেন মোস্তফা কামাল পাশা।

তবে “কারাগারে বন্দির সংখ্যা কমাতে ভার্চুয়াল আদালত জামিন দিচ্ছে কথাটা বলা যাবে না,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন সুপ্রিমকোর্ট মুখপাত্র সাইফুর রহমান।

তাঁর মতে, “জামিন দেয়ার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের। বিজ্ঞ আদালত কেন জামিন দিচ্ছেন সেব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।”

জামিন পাচ্ছেন অধিকাংশই

ঢাকা জেলা আদালতের আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বেনারকে বলেন, “করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে আদালত চলছে অনলাইনে। ভার্চুয়াল আদালতে যারা জামিনের জন্য আবেদন করছেন তাঁদের অধিকাংশই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন।”

“মহামারির আগে অনেক মামলারই জামিন বেশ কষ্টসাধ্য ছিল,” জানিয়ে প্রকাশ বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, বর্তমানে যতগুলো জামিনের আবেদন পড়ছে তার প্রায় অর্ধেকের বেশি জামিন মিলছে।”

“আমার মনে হয়, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আদালত কিছুটা উদারভাবে জামিন দিচ্ছেন,” বলেন প্রকাশ।

“তবে কোনো সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় জামিন মিলছে না। বড় কোনো অপরাধী জামিন পেয়েছে বলে আমরা দেখিনি,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, “এর ফলে আমাদের কারাগারগুলোতে কয়েদির সংখ্যা কমবে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হবে। কারাগারগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সহজ হবে।”

সাবেক অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বেনারকে জানান, দেশের কারাগারগুলোতে সাধারণত ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বন্দি থাকেন, যার মধ্যে “শতকরা ৭০ ভাগ বন্দির বিচার চলমান।”

এছাড়া চুরি, মারামারি, পারিবারিক কলহের মতো সামান্য অপরাধে অনেকেই বন্দি আছেন বলে জানান তিনি।

সরকার বিভিন্ন সময়ে বিশেষ দিবসকে সামনে রেখে ছোট অপরাধে কারাভোগ করা অনেক বন্দিকে মুক্তি দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, ছোট অপরাধে যারা কারাভোগ করছেন তাঁদের জামিন দিচ্ছেন আদালত। কোনো দাগী আসামী, খুনিদের জামিনে দিচ্ছেন না।”

তাঁর মতে, ভার্চুয়াল আদালত যেভাবে জামিন দিচ্ছে সেটি সবার জন্য ভালো। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে আদালত হয়ত উদারভাবে জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।

“কারণ, করোনাভাইরাস কারাগারগুলোতে খুব বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে,” বলেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পুরোপুরি বিচারিক কার্যক্রম বা ট্রায়াল হচ্ছে না বলে জানান সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।

“ট্রায়ালের জন্য আসামির উপস্থিতি দরকার, দুপক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিত থাকতে হবে,” জানিয়ে তিনি বলেন “যেহেতু ট্রায়াল হচ্ছে না সেহেতু বিনা বিচারে আটক রাখাটা আইনের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। সেকারণে জামিন হচ্ছে।”

“আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করা হচ্ছে না। বিরোধিতা না এলে জামিন হতেই পারে,” বলেন ব্যারিস্টার শফিক।

“বেশি জামিনের কারণে আমাদের কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমবে। আর করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বন্দিদের রক্ষা করা যাবে,” মত দেন এই সাবেক আইনমন্ত্রী।

করোনাভাইরাসের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে এর আগে দেশের সকল কারাগার থেকে বন্দি সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। মুক্তি দেয়া হয় দুই হাজার ৮৮৪ জনকে।

গত ১২ মে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিলেট কারাগারে এক হাজতির মৃত্যু হয়।

এখন পর্যন্ত ৪৭ কারারক্ষী এবং একজন গাড়িচালকসহ মোট ৪৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মঞ্জুর হোসেন।

আক্রান্তদের হাসপাতালে নির্জন ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো বন্দি করোনায়া আক্রান্ত হননি।

তবে ৬৪ জন বন্দিসহ ১৪৪ জনকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে সঙ্গনিরোধে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জামিন পাওয়াদের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ছেড়ে দেওয়া হলেও মুক্তি দেবার আগে তাঁদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হচ্ছে না বলে জানান মঞ্জুর হোসেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন