Follow us

করোনার কারণে নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে দেড় কোটির বেশি মানুষ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-06-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকায় কাজের অপেক্ষায় ফুটপাতে বসে আছেন দুইজন দিনমজুর। ২৫ জুন ২০২০। [বেনারনিউজ]
ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকায় কাজের অপেক্ষায় ফুটপাতে বসে আছেন দুইজন দিনমজুর। ২৫ জুন ২০২০। [বেনারনিউজ]
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছেন বলে সরকারি এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ওই গবেষণা অনুযায়ী, করোনাভাইরাস ঠেকাতে ২৬ মার্চ সরকারি ছুটি শুরুর দিন থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত নতুনভাবে দরিদ্র হওয়া মানুষসহ জুনে বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি।

বিআইডিএস’র গবেষণা পরিচালক ও প্রধান গবেষক ড. বিনায়ক সেন বেনারকে বলেন, করোনাভাইরাসের আগে বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের শতকরা হার ছিল ২০ ভাগ। সেই হিসাবে মার্চ মাসে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করতেন।

উল্লেখ্য, দিনে যাঁরা এক দশমিক নয় ডলার বা ১৬০ টাকার কম আয় করেন তাঁরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন বলে ধরে নেয়া হয়।

এই গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ মে থেকে ২৯ মে ২০২০ পর্যন্ত।

গত ২৫ মার্চের পর থেকে সরকার ঘোষিত দুই মাসের সাধারণ ছুটিতে দেশের শতকরা ১৩ ভাগ মানুষ তাঁদের কাজের সুযোগ হারিয়েছেন বলে জানান বিনায়ক সেন।

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের কারণে ২৬ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা ২৯ শতাংশ যা করোনাভাইরাস মহামারির আগে ছিল শতকরা ২০ ভাগ।”

এই গবেষণা পরিচালক বলেন, “এখন লকডাউন তুলে দেয়া হয়েছে। যদি সরকার আবার লকডাউন ঘোষণা না করে, সেক্ষেত্রে বছর শেষে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা মানুষের শতকরা হার হবে ২৫ ভাগ।”

শহরাঞ্চলে দারিদ্র বেশি

বিনায়ক সেন জানান, “করোনাভাইরাসের কারণে গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলে দারিদ্র পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়েছে। শহরাঞ্চলে মানুষের শতকরা ৮০ ভাগ আয় কমে গেছে।”

এই গবেষণাকে সমর্থন করে মিরপুর দুয়ারিপাড়ার বস্তির বাসিন্দা ও বাস চালকের সহকারী মো. জাকির বেনারকে বলেন, “করোনা আসার আগে একদিন পর পর গাড়িতে উঠতাম। গাড়িতে উঠলে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত পেতাম। গড়ে আমার দিনে আয় ছিল এক হাজার টাকা।”

তিনি বলেন, “সরকার গাড়ি খুলে দিয়েছে। কিন্তু যাত্রী নেই। মানুষ করোনার ভয়ে গাড়িতে ওঠে না। এখন দিনে ২৫০ টাকা আয় করা কঠিন হয়ে গেছে।”

আশুলিয়ার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় হেলপারের কাজ করতেন মো. হাবিব। করোনার কারণে কারখানা বন্ধের পর এখন তিনি মিরপুর এলাকায় রিকশা চালান।

তিনি বলেন, রিকশাই এখন আমার একমাত্র ভরসা। কিন্তু পায়ে টানা রিকশায় মানুষ উঠতে চায় না। দিনে জমা বাদ দিয়ে ২০০ টাকা আয় করতে দিন পার হয়ে যায়।

ঢাকার পূরবী সিনেমা হলের সামনে বসলেই কাজ পাওয়া যেত বলে বেনারকে জানান দিনমজুর মো. আলম। এখন সেখানে মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু কাজ নেই।

আলম বেনারকে জানান, “আগে সকালে বসলেই ঠিকাদারেরা এসে দলে দলে আমাদের নিয়ে যেত। খাওয়াসহ দিনে এক হাজার টাকা পেতাম। ভবন নির্মাণের কাজ করতাম। এখন কাজ নাই। যে দু-একজন ঠিকাদার আসে, তারা তিন’শ টাকাও দিতে চায় না। আবার প্রতিদিন কাজও পাওয়া যায় না।”

পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা

বৃহস্পতিবার অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৯ রোগী করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন। এ নিয়ে ১৮ মার্চ থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এক হাজার ৬২১ জন।

তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে তিন হাজার ৯৪৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ৮ মার্চ থেকে মোট করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা এখন এক লাখ ২৬ হাজার ৬০৬ জন।

তবে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের মূল ধাক্কাটা এখনও শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রধান ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি জানান জুলাই মাসে দেশে করোনার প্রকোপ আরো বাড়বে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের মূল প্রবাহ শুরু হবে আগামী মাসে। অর্থাৎ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আরও বাড়বে।”

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৯৪ লাখ ৯৪ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ৮৪ হাজারের বেশি।

কোরবানি পশুর হাট বসছে

পহেলা আগস্ট ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত। ওই ঈদে পশু কেনাবেচার জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পশুর হাট বসানো হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম।

বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে কোরবানির হাট সম্পর্কিত সভা শেষে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “কোরবানির হাট বসবে। নির্দিষ্ট স্থানে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে।”

এই ঈদকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে বেনারকে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তাঁর মতে, গরুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানাটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

তিনি বেনারকে বলেন, “কোরবানির হাট করোনাভাইরাসের বিস্তারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। লাখ লাখ কোরবানির পশু সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি আবাসিক এলাকার মধ্যে কেনাবেচা হবে। এখানে পশু কেনাবেচার জন্য প্রচুর জনসমাগম হবে।”

জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক বলেন, “যারা পশু আনা–নেয়ার কাজ করবেন, যারা পশুবহনকারী পরিবহন চালাবেন, যারা বাজারে পশু কিনতে যাবেন, যারা পশুর দেখাশোনা করবেন, যারা পশু জবাই করবেন, মাংস কাটবেন, বিতরণ করবেন, মাংস নেবেন সবাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।”

“করোনাভাইরাস ঝুঁকির কারণে এবার প্রতীকিভাবে হজ পালিত হচ্ছে। আমার মনে হয় সরকার আলেম-ওলামাদের সাথে বৈঠক করে এবার কোরবানি ঈদ প্রতীকিভাবে পালন করা যায় কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে,” মত দেন তিনি।

ড. মুশতাক বলেন, “আমরা যে টাকায় কোরবানি করি, সেই টাকা দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। তবে এমনভাবে করা যাবে না যাতে হাজার হাজার মানুষ টাকা নেয়ার জন্য বাসার সামনে জড়ো হয়।”

“পদপিষ্ট হয়ে যেন মানুষ প্রাণ না হারান,” যোগ করেন ড. মুশতাক।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন