Follow us

জরিপ প্রতিবেদন: করোনাভাইরাসে মৃত্যুর শঙ্কায় রোহিঙ্গা শিশুরা

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-06-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবিরে খোলা জায়গায় বসে পড়ালেখা করছে এক রোহিঙ্গা শিশু। ১৬ মে ২০২০।
টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবিরে খোলা জায়গায় বসে পড়ালেখা করছে এক রোহিঙ্গা শিশু। ১৬ মে ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রতি দশ শিশুর মধ্যে চারজন করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া অথবা স্বজন হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে বলে জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেনসহ কয়েকটি দাতা সংগঠনের পরিচালিত একটি জরিপ।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শঙ্কা ছেলে শিশুদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে বেশি।

সংগঠনগুলো গত মে মাসে শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী ২২৩ জন শিশুর ওপর করোনা মহামারির প্রভাব নিয়ে জরিপ করে। এতে অংশ নেওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশ ছেলে, ৪৮ শতাংশ মেয়ে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ শতাংশ শিশুই কোভিড-১৯ সম্পর্কে শুনেছে এবং তাদের অনেকেই এই ভাইরাসের উপসর্গগুলো জানে।

শিশুদের দুই তৃতীয়াংশ (৬৪%) নিজেরা আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে শঙ্কিত এবং প্রায় অর্ধেক (৪৯%) শিশু তাদের খেলার জায়গা এবং শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে মনঃকষ্টে ভুগছে।

প্রতিবেদন বলা হয়েছে, শরণার্থীশিবিরগুলোতে প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবারে অন্তত একজন পাঁচ বছরের বেশি বয়সের প্রতিবন্ধী অথবা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা করোনায় আক্রান্ত হলে অধিকতর জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন।

প্রায় অর্ধেক শরণার্থী প্রতিদিন পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা করোনাভাইরাসের কারণে বেশি সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনে সেভ দ্য চিলড্রেন আগামীতে একটি ৬০ শয্যার নতুন চিকিৎসা কেন্দ্র (আইসোলেশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার-আইটিসি) খুলতে যাচ্ছে। করোনা আক্রান্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজারের স্থানীয় জনসাধারণ ওই সেবা কেন্দ্রে উন্নততর স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্কের তুলনায় চার গুণ ঘনবসতির শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ভাগাভাগি করে বাথরুম এবং গোসলখানা ব্যবহার করতে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে সেখানে সামাজিক দূরত্ব বা একাকিত্ব বজায় রেখে চলা কঠিন ব্যাপার। বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম এই শরণার্থীরা আজ করোনাভাইরাসের কারণে আরও বেশি বিপন্ন।

বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যান ভ্যান ম্যানেন বলেছেন, “শিশুরা আমাদের বলেছে তারা মারা যাবে বলে ভয় পাচ্ছে। মৃত্যু ভয় বা স্বজন হারানোর ভীতি শিশুদের জন্য বিশেষ কষ্টদায়ক। এই শিশুদের অনেকেই এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ভয়ানক বেদনা এবং স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। তাদের মিয়ানমারে নিজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং তিন বছর ধরে অতি ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে গাদাগাদি করে বাস করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা শিবিরগুলো করোনাভাইরাস মুক্ত রাখার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি, যদিও আমরা বুঝতে পারছি তাদের আক্রান্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যদের সঙ্গে সেভ দ্য চিলড্রেন মানুষকে সচেতন করা এবং করোনাভাইরাসের বিস্তার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চাই শিশুরা যাতে স্বাস্থ্য সেবা পায় এবং তাদের নিরাপদ রাখা যায়।”

“আমাদের নতুন চিকিৎসা কেন্দ্রে মাঝারি থেকে মারাত্মক সংকটাপন্ন করোনা আক্রান্ত অথবা সম্ভাব্য আক্রান্তদের সেবা দেওয়া হবে। ৮০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং সহযোগীদের দিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্রটি চালানো হবে। সেভ দ্য চিলড্রেনের নিজস্ব জরুরি স্বাস্থ্য ইউনিটের কর্মীরা, যারা সংক্রমণ রোধে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তারাও এর সঙ্গে যুক্ত হবেন। করোনা আক্রান্ত সন্তানসম্ভবা নারীদের নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য একটি প্রসূতিকেন্দ্রও এখানে থাকবে,” যোগ করেন সংগঠনটির বাংলাদেশ প্রধান।

সেভ দ্য চিলড্রেনের জরুরি স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান রাচেল পাউন্ডস বলেন, “বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্রুত বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাঁদের আশ্রয়দানকারী কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা বিপর্যয়কর প্রাণহানির কারণ হতে পারে।”

“আমরা জানি না ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে কোভিড ১৯ কী রকম তাণ্ডব চালাবে। এসব শিবিরে শিশুরা সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপ্রবণ। কারণ তারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, ভ্যাকসিন এবং পুষ্টির অভাবে আছে। ফলে এখানে সংক্রমণ সবচেয়ে মারাত্মক হতে পারে,” বলেন তিনি।

পাউন্ডস বলেন, “কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাস মোকাবিলায় আমরা যেভাবে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছিলাম, কক্সবাজারে কোভিড-১৯ মোকাবিলায়ও তা প্রয়োজন। শিশু এবং বয়স্কদের আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সক্ষম বানানোর মাধ্যমে সংক্রমণ কমানোই সবচেয়ে ভালো উপায়।”

নতুন আক্রান্ত এক রোহিঙ্গা

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রধান স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া বেনারকে জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৃহস্পতিবার আরও একজন রোহিঙ্গা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। এই নিয়ে ক্যাম্পে ৪৭ জন রোহিঙ্গা করোনা আক্রান্ত হলেন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত মোট পাঁচ জন রোহিঙ্গা মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা এক লাখ ২৬ হাজার ৬০৬ জন। এখন পর্যন্ত দেশে এই রোগে মারা গেছেন মোট এক হাজার ৬২১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৯৪ লাখ ৯৪ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন চার লাখ ৮৪ হাজারের বেশি।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন