Follow us

করোনাভাইরাস পরীক্ষায় প্রতারণা: সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে মামলা, তিনজন আটক

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-07-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ঢাকার বেসরকারি সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসনাতকে আটক করে র‍্যাব। ১৯ জুলাই ২০২০।
করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ঢাকার বেসরকারি সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসনাতকে আটক করে র‍্যাব। ১৯ জুলাই ২০২০।
[বেনারনিউজ]

রিজেন্ট ও জেকেজির পরে এবার করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ঢাকার বেসরকারি সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব।

সোমবার রাতে মামলাটি দায়ের করা হয় বলে নিশ্চিত করেন গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান।

তিনি বেনারকে বলেন, “আসামিদের দুজন আটক এবং একজন পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।”

এর আগে রোববার বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে গুলশানের সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. আবুল হাসনাত এবং কর্মকর্তা সাহরিজ কবির সাদিকে আটক করা হয়।

সোমবার বিকেলে বনানীর একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার হন হাসপাতালের পরিচালক ফয়সাল আল ইসলাম। এ তিনজনকেই এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

মঙ্গলবার র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতারণার দায়ে হাসপাতালটিকে সিলগালা করে দিতে পারে বলেও জানা যায়।

করোনাভাইরাস মহামারির এই সময়েও এভাবে একের পর এক হাসপাতালের প্রতারণা ও জালিয়াতির চিত্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের রুগ্ন দিককে তুলে ধরছে বলে মনে করছেন চিকিসা নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক আতিক আহসান।

তিনি বেনারকে বলেন, “বৈশ্বিক মহামারিতে যখন পৃথিবী থমকে গেছে ঠিক তখনই সামান্য স্বার্থের কারণে এই হাসপাতালগুলো মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আগে থেকেই দুর্বল, কিন্তু এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো কিছু কিছু হাসপাতাল কতোটা অসৎ।”

“সরকারের নজরদারির অভাবেই প্রতিনিয়িত এরা চিকিৎসার নামে মানুষ ঠকিয়েছে। তাই এই দায় সরকারকেও নিতে হবে,” মনে করেন আতিক আহসান।

তবে তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম-দুর্নীতিরোধেই হাসপাতালগুলোতে অভিযান চলছে।

সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, “স্বাস্থ্যখাতে সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে সরকারের কর্মসূচির অংশ হিসেবেই সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

হাসপাতালটির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারের কপি বেনার প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

এজাহার অনুযায়ী, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নেগেটিভ রোগীকে করোনা পজিটিভ রোগী বলে চিকিৎসা দেওয়া, পরীক্ষা না করে ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়া এবং অনুমোদন না নিয়েই র‌্যাপিড কিট দিয়ে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করিয়ে আনার অভিযোগে আনা হয়েছে।

মামলার বিবরণে বলা হয়, হাসপাতালটি রোগীদের কাছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করে আসছিল। চোরাই পথে র‌্যাপিড টেস্টের কিট এনে সরকারের অনুমোদন ছাড়াই করোনা রোগীর এন্টিবডি টেস্টের নামে পরীক্ষা না করেই ভুয়া সনদ দিয়েছে এই হাসপাতাল।

হাসপাতালটির পাঁচটি অপারেশন থিয়েটারের একটিতে তল্লাশি চালিয়ে পাঁচটি মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল টিউব যায় র‌্যাব। হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদও গত বছর শেষ হয়ে গেছে।

এতে বলা হয়, গত মার্চ থেকে করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীকে পরীক্ষা না করে ভুয়া সনদ দিয়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে। এসবের সাথে হাসপাতালের পরিচালক ফয়সাল, সহকারী পরিচালক আবুল হাসনাত ও শাহরিজ কবির জড়িত।

এই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা পরস্পর যোগসাজশে করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করে ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এই অভিযোগে দোষীদের বিরদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

এজাহারে বলা হয়, গত ৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটিকে কভিড-১৯ পরীক্ষা করার অনুমতি দিলেও পরীক্ষার সরাঞ্জমাদি এবং অবকাঠামো না থাকায় ১২ জুলাই তা স্থগিত করে।

মঙ্গলবার সিলগালা হতে পারে

রোববার রাতে অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালটিতে যে সব রোগী আছেন তাঁরা অন্যত্র চলে যাওয়ার পর সিলগালা করে দেওয়া হবে।

যদিও সোমবার পর্যন্ত হাসপাতালটি সিলগালা হয়নি। তবে এখানকার রোগীদের অন্যত্র সরে যেতে দেখা যায়।

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মাত্র নয়জন সাধারণ এবং করোনায় আক্রান্ত ১৮ জন রোগী আছেন।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহাবউদ্দিন সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, করোনা আক্রান্তদের তিনজন বর্তমানে আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন। এছাড়া করোনা আক্রান্তদের মধ্যে আটজন রাশিয়ান রয়েছেন।

তিনি জানান, হাসপাতালটির এসব অনিয়ম সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

সাহাবুদ্দিন বলেন, “কোনো অনিয়ম থাকলে তার বিচার হোক কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে যেনে মানুষকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না করা হয়।”

তবে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বেনারকে বলেন, “সোমবার রাতের মধ্যে সকল রোগীর হাসপাতাল ছাড়ার কথা। তাঁরা হাসপাতাল ছাড়লে মঙ্গলবার হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হতে পারে। কালই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”

সাবরিনা কারাগারে

কভিড-১৯ পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে করা মামলায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান চিকিৎসক সাবরিনা চৌধুরীকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দুই দফায় রিমান্ড শেষে সাবরিনাকে সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠায়। এসময় তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করা হয়।

গত ১২ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা ডা. সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই মামলায় তাঁর স্বামী জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হক চৌধুরী ও তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদ চৌধুরীকে রিমান্ডে শেষে রোববার কারাগারে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ। আর এই ভাইরাসে প্রথম রোগীর মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ সাত হাজার ৪৫৩ জন। আর মৃত্যু হয়েছে দুই হাজার ৬৬৮।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট এক কোটি ৪৫ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ছয় লাখ সাত হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন