করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমায় স্বাভাবিক হচ্ছে জনজীবন

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
2020.08.17
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
200817_Coronavirus-1000.jpg দীর্ঘ পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর সোমবার খুলে দেয়া হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। প্রথম দিনেই সৈকতে এসেছেন অনেক পর্যটক। ১৭ আগস্ট ২০২০।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

এখনো দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন করোনাভাইরাসে। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় ‘কমতে থাকায়’ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। দীর্ঘ পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর সোমবার খুলে দেয়া হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

একইদিন দেশে ২৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে করোনাভাইরাস রোগীদের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা কমেনি, বরং হাসপাতালগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা না থাকায় তাঁরা হাসপাতালে যাচ্ছেন না, পরীক্ষাও করতে চাইছেন না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা কমছে এই কথাটা ঠিক নয়। পরীক্ষা কম হচ্ছে তাই সংখ্যা কম হচ্ছে। আবার হাসপাতালের ওপর মানুষ আর পুরোপরি আস্থা রাখতে পারছে না। তাই হয়তো হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কম। মানুষ বাসায় চিকিৎসা করাচ্ছে।”

কমছে হাসপাতাল

“করোনাভাইরাস রোগীর সংখ্যা দিন দিন কমছে,” মন্তব্য করে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বেনারকে বলেন, “আমাদের ৮৭টি ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার রোগীর করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা সম্ভব। সেখানে পরীক্ষা হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার।”

“রোগীরা পরীক্ষা করতে আসে না,” বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

“বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে সবচেয়ে বেশি কোভিড রোগী রয়েছে,” জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কোভিড রোগীর সংখ্যা খুব কম। মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতালে কোনো কোভিড রোগী নেই।”

“ঢাকা, চট্টগ্রামে মোট ৩০ কোভিড হাসপাতালে ৭০ ভাগের মতো বেড খালি পড়ে আছে,” জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের তথ্যমতে, সারাদেশে কোভিড নির্ধারিত ১৫ হাজার ২৫৫টি শয্যার মধ্যে ১০ হাজার ৯৫৪টি ফাঁকা রয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যেসকল হাসপাতালে কোভিড রোগীর সংখ্যা কম সেগুলোকে কোভিড হাসপাতালের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।

তবে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, মুগদাসহ কয়েকটি হাসপাতাকে কোভিড বিশেষায়িত হিসাবে রাখা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই মাসের শেষ দুই সপ্তাহে দেশে প্রতিদিন গড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৭৩৬ জন, যা থেকে আগস্টের প্রথম দুই সপ্তার দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন কম।

আগস্টের প্রথম দুই সপ্তায় গড়ে দৈনিক আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৪৪৪ জন।

অন্যদিকে জুলাইর শেষ দুই সপ্তায় করোনাভাইরাসে গড়ে প্রতিদিন মারা গেছেন ৩৮ জন, যা আগস্টের প্রথম দুই সপ্তায় নেমে এসেছে গড়ে দৈনিক ৩৪টি মৃত্যুতে।

‘মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানবে না’

বাংলাদেশে কোভিড হাসপাতাল খোলার সময় যেমন খুব বেশি চিন্তা ভাবনা করা হয়নি তেমনি এখন হাসপাতালের সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রেও “তেমন কোনো চিন্তা ভাবনা হচ্ছে না” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. বেনজির আহমেদ।

“সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় কোভিড হাসপাতাল কমিয়ে দেয়া হচ্ছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যে কোভিড হাসপাতালের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছি এর ফলাফল কী হতে পারে সেব্যাপারে আমাদের চিন্তা করতে হবে।”

তাঁর মতে, এই ঘোষণার ফলে মানুষ মনে করবে করোনাভাইরাস আর কোনো সমস্যা নয়। মানুষ কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মানবে না।

“এর ফলাফল আরও খারাপ হতে পারে। কোভিড রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। আর রোগীর সংখ্যা বাড়লে তখন আবার একটি হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতালে রূপান্তর করা কঠিন হবে,” বলেন ড. বেনজির।

তাঁর মতে, “হাসপাতাল কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি ঘটা করে বলার দরকার ছিল না। এটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয়।”

অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, “যেসকল হাসপাতালকে কোভিড তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে সেগুলোকে এমন ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখতে হবে যাতে করোনাভাইরাস রোগীর সংখ্যা বাড়লে দ্রুত সেগুলোকে আবার কোভিড হাসপাতালে রূপান্তর করা যায়।

তবে “হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে,” বলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

খুলেছে কক্সবাজার সৈকত

করোনা সংক্রমণ ‘কিছুটা কমার’ প্রেক্ষাপটে মহামারিতে কর্মহীন হয়ে পড়া পর্যটন-সংশ্লিষ্ট প্রায় দুইলাখ কর্মজীবীর কথা মাথায় রেখে সোমবার থেকে ‘সীমিত আকারে’ পর্যটন খুলে দেয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।

সোমবার কক্সবাজার সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ প্রায় পাঁচমাস পর আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে সমুদ্র সৈকত। আসতে শুরু করেছেন পর্যটকরা।

চট্টগ্রাম থেকে আসা সবুজ শর্মা বেনারকে বলেন, “ঘরবন্দি থাকতে আর ভালো লাগছিল না, তাই এখানে ছুটে আসা। ভালো লাগছে।”

ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসা স্নিগ্ধা রহমান বলেছেন, “করোনার সংক্রমণ এখনো চলছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আমরা ভ্রমণ করছি। তবে দুঃখের বিষয় এখানে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।”

সোমবার ঢাকা থেকে ১৩ জোড়া ট্রেন চলাচল শুরু করেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়াজাহান। তিনি বলেন, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সকল আন্তনগরসহ কিছু মেইল ট্রেন চলাচল শুরু করবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ট্রেনগুলো পরিচালনা করা হবে।

রোহিঙ্গা রোগী ৭৯

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া সোমবার বেনারকে জানান করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ৭৯ জন রোহিঙ্গা আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ছয়জন।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন ৮ মার্চ। এই রোগে দেশে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৮ মার্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ ৭৯ হাজার ১৪৪ জন। আর মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ৬৯৪ জনের।

আক্রান্তের সংখ্যার দিকে থেকে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট দুই কোটি ১৭ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন সাত লাখ ৭৬ হাজারের বেশি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।