Follow us

বেশিরভাগ চিকিৎসা-বর্জ্য মিশে যাচ্ছে সাধারণ বর্জ্যের সাথে, বাড়ছে ঝুঁকি

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-08-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
করোনাকালীন সময়ে গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে সংক্রামক বর্জ্য আলাদা রাখার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ থলে বিতরণ করছেন কর্মীরা।২৮ জুন ২০২০।
করোনাকালীন সময়ে গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে সংক্রামক বর্জ্য আলাদা রাখার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ থলে বিতরণ করছেন কর্মীরা।২৮ জুন ২০২০।
[সৌজন্যে: ডিএনসিসি]

দেশের ৯০ ভাগের বেশি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য মিশে যাচ্ছে সাধারণ বর্জ্যের সাথে। এর সাথে চলমান করোনাভাইরাস চিকিৎসা সংক্রান্ত বর্জ্য মিশে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে কয়েক লাখ পরিচ্ছন্নতা কর্মীর।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক ব্রিটিশ একাডেমিক জার্নাল ‘ল্যানসেট’ এবং বাংলাদেশের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত একমাত্র বেসরকারি সংস্থা প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশের ১৪ হাজার ৭৭০টি সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৪৫৮টি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সঠিক নিয়মে ধ্বংস করা হয়।

পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে “বর্তমানে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই আমাদের অন্যতম চিন্তার বিষয়,” বলে বৃহস্পতিবার বেনারের কাছে মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম।

এ বিষয়ে সরকারের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে জানালেও বিস্তারিত বলতে রাজি হননি নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের এই কর্মকর্তা।

প্রিজম বাংলাদেশ এর তথ্যমতে, বর্তমানে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার আওতাধীন ৩৪২টি শহরাঞ্চলের মধ্যে মাত্র ছয়টি এলাকার চিকিৎসা বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধিত হচ্ছে।

এদিকে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগামী বছরের আগে এই উদ্যোগের সুফল মিলবে না বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক।

তিনি বলেন, “সংক্রামক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সর্বত্র ‘ডেডিকেটেড ডাস্টবিন’ রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে।”

আগেই খারাপ ছিল পরিস্থিতি

“করোনা সংক্রমণের আগে থেকেই বাংলাদেশ হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছিল,” বলে মন্তব্য করা হয়েছে গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘ল্যানসেট’-এর নিবন্ধে।

এতে বলা হয়, “মাস্ক, গ্লাভস ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর যদি নিয়ন্ত্রিতভাবে অপসারণ করা না হয় তবে তা থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি থেকে যায়।”

নিবন্ধে বলা হয়, সারা বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ৫২ লাখ মানুষ মেডিক্যাল বর্জ্যজনিত অসুখে মারা যান, যার মধ্যে ৪০ লাখই শিশু।

নিবন্ধটির অন্যতম লেখক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “বিষয়টি এখন কোভিডের কারণে সামনে আসলেও এটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই আমরা ভুগছি।”

“দেশজুড়ে প্রতিদিন কী পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে, এর কত ভাগ সংক্রামক, সেই হিসাবও কোথাও নেই,” জানিয়ে ড. মোস্তাফিজ বলেন, পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

যে কোনো হাসপাতালের একটি শয্যায় দৈনিক এক থেকে দুই কেজি বর্জ্য তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “সব মিলে ব্যাপকহারে চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে।”

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব বর্জ্য অরক্ষিত ও অসচেতনভাবে সংগ্রহ করে অননুমোদিত জায়গায় ফেলা হয় জানিয়ে ল্যানসেট এর নিবন্ধে বলা হয়, চিকিৎসা বর্জ্য পৃথক করা বা নিরাপদে ধ্বংস করার যথাযথ নিয়মগুলো মানা হয় না।

এক্ষেত্রে চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা-২০০৮ হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রিজমের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আনিসুর রহমান বেনারকে বলেন, “বিধিটা যুগোপযোগী নয় বিধায় সবাইকে বাধ্য করা যাচ্ছে না।”

দেশের ৩৩০টি পৌরসভা ও ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে রাজধানীসহ মাত্র ছয়টি শহর ছাড়া বাকিগুলোতে সাধারণ বর্জ্যের সাথেই চিকিৎসা-বর্জ্য অপসারণ করা হয় বলে বেনারকে জানান প্রিজমের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ক মাজহারুল ইসলাম।

“সরকার একের পর এক পৌরসভা-সিটি কর্পোরেশন বানিয়েছে, কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি করেনি,” বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আনিসুর রহমান।

এদিকে সরকারের অবহেলার জন্যই দেশে সাধারণ বর্জ্য পরিশোধনের যথাযথ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে অভিযোগ করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “এখনও আমরা শুধু ‘সলিড ওয়েস্টের’ কথা চিন্তা করছি। যে বিপুল পরিমাণ ‘ওয়েস্ট ওয়াটার’ প্রতিটি হাসপাতাল থেকে বের হয়, কেউ তো খেয়ালও করে না। এটা সাধারণ ড্রেনে যায়, যা খুবই ঝূঁকিপূর্ণ।”

বেড়ে চলেছে কোভিড বর্জ্য

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ২০৬ টনের বেশি করোনা-জনিত বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে বলে বেনারকে জানান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক ড. শাহরিয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, “এসব বর্জ্যের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা পরিবেশের জন্য হুমকি; যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াবে।”

১৬ বছর ধরে সক্রিয় প্রিজম বর্তমানে ঢাকার দুই সিটির ৯২৩টি, নারায়নগঞ্জের ১০২টি, রংপুরের ২১৬টি, সিলেটের ১০৮টি, সাভারের ৪৫টি এবং যশোরের ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণ ও পরিশোধন করছে।

“বর্তমানে যে চিকিৎসা বর্জ্য আসছে, তার ৮০ শতাংশই কোভিড-বর্জ্য। এটা আমাদের জন্য একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন ছয়-সাত টন শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক পাচ্ছি,” বলেন আনিসুর।

করোনাভাইরাসের কারণে সব ধরনের চিকিৎসা বর্জ্যই এখন পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে জানান তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা নৌ কমডোর এম সাইদুর রহমান বেনারকে বলেন, সপ্তাহে দুই দিন বাসায় বাসায় গিয়ে সংক্রামক জাতীয় বর্জ্য সংগ্রহ করছেন তাঁদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। পরে প্রিজমের সহায়তায় সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।

তবে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে জানিয়েছে প্রিজমের কর্মকর্তারা।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে সরেজমিনে মনিটরিং বন্ধ রয়েছে বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট) বেগম রুবিনা ফেরদৌসী।

এই পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে “ডেকে এনে অফিসে বসেই শুনানি” করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের এক প্রকাশনার তথ্য অনুযায়ী ২০০০ সালে অবিভক্ত ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার সাতশ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হতো। যার মধ্যে অন্তত ৪০ টন সংক্রামকসহ কমপক্ষে দুইশ মেট্রিক টন হাসপাতাল বর্জ্য।

ঝুঁকিতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা

“সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, হাসপাতাল, রেলওয়েসহ কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কর্মীই সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণ পায়নি,” বেনারকে জানান বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের মহাসচিব নির্মল চন্দ্র দাস।

তাঁদের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে ৩৮ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন চার জন।

হরিজন সম্প্রদায়ের প্রায় ১৫ লাখ মানুষ পরিচ্ছন্নতা পেশার ওপর নির্ভরশীল দাবি করে নির্মল জানান, প্রথম দিকে তাঁদের কোনো সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়নি। পরে কয়েক দফা দাবির প্রেক্ষিতে কিছু সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

“গ্লাভস ছাড়া কাজ করতে গিয়ে করোনার ময়লা হাত দিয়ে ধরতে হচ্ছে আমাদের,” বেনারকে বলেন ডিএসসিসি স্ক্যাভেঞ্জার এন্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ঝুঁকি ভাতার দাবি তুললেও কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া মেলেনি বলে জানান ইউনিয়ন নেতারা।

এদিকে পেশাদার পরিচচ্ছনতা কর্মীর বাইরে বর্জ্য থেকে বিভিন্নি জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করার পেশায় প্রায় ৪০ হাজার টোকাইও যুক্ত রয়েছে বলে জানান ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

এই টোকাই শিশুরা চরম ঝুঁকিতে আছে জানিয়ে অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তারা কোনো মনিটরিংয়ের আওতায়ই নেই।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৯ জন। আর মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ৮২২ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট দুই কোটি ২৫ লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন সাত লাখ ৮৯ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন