Follow us

গবেষণা প্রতিবেদন: মহামারিতে ঘরে থাকায় বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-08-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবিতে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সমাবেশ। ৮ মার্চ ২০১৯।
নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবিতে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সমাবেশ। ৮ মার্চ ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় ঘরে থাকার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে গত পাঁচ মাসে মানুষের আয় কমেছে, বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও অস্ট্রেলিয়ার ওয়াল্টার এলিজা হল ইন্সটিটিউটের যৌথ এক গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ মহিলা ও তাঁদের পরিবারের ওপর করোনাভাইরাস মহামারি এবং সরকারের ঘরে থাকার নির্দেশের প্রভাব সম্পর্কিত এই গবেষণার ফলাফল বুধবার প্রকাশ করা হয়।

এতে দেখা গেছে, মার্চের শেষ দিক থেকে মে পর্যন্ত প্রায় দুই মাস ঘরে থাকার কারণে দেশের নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারগুলোতে অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া ওই সময়ে নারীদের ওপর স্বামী ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী দ্বারা নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে।

গবেষণায় অনুযায়ী, ৯৬ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক উপার্জন হ্রাস পেয়েছে এবং ৯১ শতাংশ নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল মনে করেছেন।

এছাড়া ৪৭ শতাংশ পরিবারের আয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমার (দৈনিক ১.৯০ ডলার) নিচে চলে গেছে। পাশাপাশি, পরিবারগুলোর ৭০ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং ১৫ শতাংশ খাদ্য সংকট, অভুক্ত অবস্থায় অথবা কোনো এক বেলা না খেয়ে ছিলেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর লকডাউনের বিশেষ প্রভাব সম্পর্কে গবেষণায় বলা হয়েছে, “মহিলাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে এবং ৬৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন তাঁদের দুশ্চিন্তার প্রবণতা বেড়ে গেছে।”

“স্বামী ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর মাধ্যমে যেসব নারী শারিরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন তাঁদের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক নারী বলেছেন, লকডাউনের সময় শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন বেড়েছিল,” বলা হয় গবেষণার ফলাফলে।

গবেষণাটিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ২ হাজার ৪২৪ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক নির্যাতনে লকডাউনের প্রভাব দেখা হয়েছে বলে জানানো হয় আইসিডিআরবি’র এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ, প্রথম মৃত্যু ১৮ মার্চ। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে সরকার।

এর আগে বাংলাদেশের দারিদ্রের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেনের নেতৃত্বে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়।

সেই গবেষণা অনুযায়ী করোনা মহামারির আগে বাংলাদেশে দারিদ্রের হার ২০ শতাংশ ছিল বলে বেনারকে জানান ড. বিনায়ক সেন।

তিনি বলেন, “২৬ মার্চ সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯ শতাংশে।”

তবে “আমি বাংলাদেশ নিয়ে হতাশ নই,” মন্তব্য করে ড. বিনায়ক বলেন, “এখন মানুষ আর ঘরে নেই। সবাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঢুকে পড়েছে। সুতরাং, দারিদ্র পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।”

“আমরা আমাদের গবেষণায় দেখেছি ডিসেম্বর নাগাদ দারিদ্র পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং তা শতকরা ২৫ ভাগে আসবে,” যোগ করেন ড. বিনায়ক।

বিআইডিএস’র ওই গবেষণা অনুযায়ী করোনাভাইরাসের কারণে গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলে দারিদ্র পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়েছে। শহরাঞ্চলে মানুষের শতকরা ৮০ ভাগ আয় কমেছে।

‘বিভিন্ন কারণে বেড়েছে সহিংসতা’

করোনাভাইরাস মহামারির সময় পারিবারিক সহিংসতার ওপর একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

গত ১০ জুন প্রকাশিত ওই জরিপ অনুযায়ী, এ বছর এপ্রিল মাসের চেয়ে মে মাসে দেশে নারী নির্যাতন বেড়েছে ৩১ শতাংশ। ওই সকল নির্যাতনের বেশিরভাগই পারিবারিক সহিংসতা বলে উল্লেখ করা হয়।

“সরকার ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়ার পর পারিবারিক সহিংসতা বাড়বে এমন পূর্বাভাস আগেই এসেছিল। লকডাউনের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে,” বেনারকে বলেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ফেরদৌসী সুলতানা।

তবে করোনাভাইরাসের কারণে পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কোনো বলা যাবে না, বরং বিভিন্ন কারণে সহিংসতা বেড়েছে বলে জানান ফেরদৌসী।

তিনি বলেন, “প্রথম কথা হলো, করোনাভাইরাসের কারণে অনেক নারী–পুরুষ চাকুরি হারিয়েছেন। জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে হতাশার মধ্যে পড়েছেন অনেকে। হতাশা থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা আসবে।”

এছাড়া মহামারির কারণে অনেক পরিবার গৃহকর্মী বাদ দিয়ে আগে তাঁরা যেসব কাজ করতেন না সেইসব গৃহস্থালি কাজ করছেন জানিয়ে ফেরদৌসী বলেন, “একসাথে থাকতে থাকতে একঘেয়েমি এসেছে। সেখান থেকে কিছু সহিংসতা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।”

বাংলাদেশে শতকরা কত ভাগ মহিলা তাঁদের জীবন নিয়ে হতাশ সে ব্যাপারে পূর্বের কোনো গবেষণা নেই বলে জানান ফেরদৌসী।

“তবে মহিলাদের একটি বড় অংশ পারিবারিক বিভিন্ন কারণে জীবন সম্পর্কে হতাশ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই,” বলেন তিনি।

এদিকে বুধবার প্রকাশিত গবেষণা সম্পর্কে “বিস্তারিত না জেনে বা বুঝে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না,” বলে জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরিদা পারভীন।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে বাংলাদেশে একটি প্রকল্প রয়েছে। এর আওতায় একটি হটলাইন চালু আছে জানিয়ে তিনি বলেন, “নির্যাতিতরা সরাসরি ১০৯ নাম্বারে ফোন করে প্রতিকার পেতে পারেন। এই নম্বরে অনেক কল আসে। সাহায্য চাইলে পুলিশ নির্যাতিতদের সহায়তা করে।”

এছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় মেডিক্যাল কলেজে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার আছে। নির্যাতনের শিকার নারী ও মেয়েদের সেখানে রেখে চিকিৎসা সেবাসহ সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

“তবে আমাদের হটলাইনে আসা কল সম্পকির্ত তথ্য এবং সারাদেশের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে—এ কথা বলা যায় না,” বলেন ফরিদা পারভীন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তিন লাখ দুই হাজার ১৪৭ জন। আর মৃত্যু হয়েছে চার হাজার ৮২ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট দুই কোটি ৪০ লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন আট লাখ ২১ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন