করোনাভাইরাস: গণপরিবহন বন্ধ তবু সংক্রমণ ভয় উপেক্ষা করে স্রোতের মতো ছুটছে মানুষ

কামরান রেজা চৌধুরী
2021.05.11
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
করোনাভাইরাস: গণপরিবহন বন্ধ তবু সংক্রমণ ভয় উপেক্ষা করে স্রোতের মতো ছুটছে মানুষ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য মাওয়া ফেরিঘাটে মানুষের ভিড়। ১১ মে ২০২১।
[বেনারনিউজ]

সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলমান লকডাউনের মধ্যে ঈদ পালন করতে ঢাকা ছাড়ছে লাখ লাখ মানুষ। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার বাংলাদেশে ঈদ হতে পারে। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সারা দেশে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ থাকলেও স্রোতের মতো মানুষ ঢাকা ছাড়ছে, আর এতে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইতিমধ্যে করোনার ভারতীয় ধরন বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। 

বাংলাদেশে ভাইরাসের ভারতীয় ধরন ধরা পড়ার মধ্যেই লোকজনের এমন ঈদযাত্রায় দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে বলে বেনারকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। 

দেশের বাইরে থেকে আসা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতসহ ১৩টি দেশ এবং যুক্তরাজ্য বাদে সকল ইউরোপীয় দেশের বিমানযাত্রী পরিবহন বন্ধ রয়েছে।

এছাড়া ভারতীয় ধরনের বাংলাদেশে বিস্তার রোধে দেশটির সাথে গত ২৬ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশের সকল স্থলবন্দর বন্ধ আছে, যা চলবে মে মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত। 

তবে এসব সতর্কতার মধ্যেও গত কয়েকদিনের মতো মঙ্গলবারও গ্রামে ঈদ করার জন্য হাজার হাজার মানুষ উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখা গেছে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ফেরিঘাটে। এই পথে গত কয়েক দিনে লাখ লাখ মানুষ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে যাত্রা করেছেন।

দেশের বাংলা জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো একটি মুঠোফোন কোম্পানির বরাত দিয়ে মঙ্গলবার প্রকাশিত খবরে বলেছে, সোমবার পর্যন্ত আগের এক সপ্তাহে ওই কোম্পানির মোবাইল ফোন ব্যবহার করা ২৮ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। 

এদিকে মানুষের চলাচল ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করেও লাভ হয়নি। পণ্য পরিবহনের জন্য নির্ধারিত ফেরিগুলো যাত্রীবাহী ফেরিতে রূপ নেয়। 

‘বাড়িতে অপেক্ষায় সবাই’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিসি) মহাপরিচালক (যাত্রী ও ফেরি) এস. এম. আশিকুজ্জামান মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতে মাওয়া ঘাট থেকে মোট ১৬টি ফেরি চলাচল করছে। এগুলো পরিচালনার উদ্দেশ্য পণ্যবাহী যানবাহন পারাপার।

তিনি বলেন, “হাজার হাজার মানুষ পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে পায়ে হেঁটে মাওয়া ঘাটে আসছে। ঘাটে এসেই ফেরির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কিছু করার নেই।” 

“মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে আমরা কিছু করতে পারবনা,” মন্তব্য করে আশিকুজ্জামান বলেন, গত কয়েক দিনে কয়েক লাখ মানুষ ফেরিতে পারাপার হয়েছেন। এর সঠিক হিসাব দিতে পারব না। 

ঢাকার গাবতলি থেকে কোনো দূরপাল্লার গাড়ি না ছাড়লেও মালামাল পরিবহনের ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ইজিবাইক, রিকশা, বেবিট্যাক্সিসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে মানুষ।

যারা কোনো যানবাহন পাচ্ছেন না অথবা বেশি ভাড়া দিতে পারছেন না তাঁরা রওনা দিয়েছেন পায়ে হেঁটে। 

ঢাকা থেকে রংপুরের পথে রওনা হয়েছেন তৈরি পোশাক কর্মী মো. আলম। তিনি বেনারকে বলেন, “ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনেছি।” 

কীভাবে যাবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কিছু দুর হেঁটে গেলে কিছু একটা পেয়ে যাব। এরপর আরেকটিতে চড়ব। বেরিয়েছি যখন তখন পৌঁছাব ইনশাল্লাহ।” 

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপারে তিনি বলেন, “যদি হয় কিছু তো করার নেই।” 

হাইওয়ে পুলিশের বগুড়া জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যমুনা বহুমুখী সেতু হয়ে সোমবার পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করেছে। 

সরকারি নিষেধ অমান্য করে যারা দূরপাল্লার গাড়ি চালাচ্ছে এমন অনেক গাড়ি আটক করে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

ভারতীয় ধরনের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ

চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় প্রকোপে এপ্রিলের প্রথম সপ্তার শেষ দিকে বাংলাদেশে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়।

সংক্রমণ ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল সারা দেশে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তায় দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা নেমে আসে দেড় হাজারের নিচে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে চিহ্নিত হওয়া ভাইরাসের ভারতীয় ধরনের বিস্তার ঠেকাতে না পারলে পরিস্থিতি আবারো মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষদের মাধ্যমেই এই ধরন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “মানুষ যেভাবে দলে দলে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে তাতে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটির বিস্তার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মূলত গ্রামের বাড়ি থেকে ঈদ করে ঢাকায় ফেরার পর সংক্রমণ বাড়বে।” 

করোনার এই ধরন যাতে “সীমান্ত জেলাগুলো থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সীমান্ত জেলাগুলোতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে,” বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

“চলমান সরকারি কিছু বিধিনিষেধের কারণে বর্তমানে সংক্রমণ কমে এসেছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয় ধরনের বিস্তার রোধ করতে না পারলে “এই অর্জন ধরে রাখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।” 

“মানুষকে বোঝাতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এবং মাস্ক পড়তে হবে,” বলেন ডা. নজরুল ইসলাম। 

বন্ধ বিমান যোগাযোগ

ঢাকা শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক তৌহিদুল হাসান মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে গত ৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্য ছাড়া সমগ্র ইউরোপীয় রাষ্ট্রসহ আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়ে থেকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সরকার।

তিনি বলেন, ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরে ভারতের সাথে বিমান যোগাযোগ এবং সকল স্থলবন্দর মানুষ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয় সরকার, এই নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে বিমানযাত্রীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কুয়েত, ওমান ও ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলো।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েছে। আমাদের সচেতন হতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, ঘরে থাকতে হবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সাত লাখ, ৭৬ হাজার ২৫৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার ৫ জনের। 

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ৩৩ লাখ ৮ হাজারের বেশি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন