Follow us

সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা এনু-রূপনের বাড়ি থেকে নগদ ২৬ কোটি টাকা উদ্ধার

কামরান রেজা চৌধুরী, প্রাপ্তি রহমান ও শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-02-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কারাগারে থাকা ঢাকার গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তাঁর ভাই রূপন ভূঁইয়ার মালিকানাধীন পুরান ঢাকার একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও অন্যান্য সম্পদ উদ্ধার করে র‍্যাব। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
কারাগারে থাকা ঢাকার গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তাঁর ভাই রূপন ভূঁইয়ার মালিকানাধীন পুরান ঢাকার একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও অন্যান্য সম্পদ উদ্ধার করে র‍্যাব। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

ঢাকায় মঙ্গলবার ছিল দুটি বড় ঘটনা। একটি হচ্ছে, অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের দুই সাবেক নেতার বাড়ি থেকে ২৬ কোটির বেশি নগদ টাকাসহ পাঁচ কোটিরও বেশি টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত) ও এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার।

অন্যটি হচ্ছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের প্রতি শৈথিল্য দেখাচ্ছে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অভিযোগ। এছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের হয়রানি করতে দুদককে ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি।

মঙ্গলবার উদ্ধার হওয়া টাকার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বেনারকে বলেন, “বিশাল সমুদ্রের দুর্নীতি হয়েছে সরকারের বিভিন্ন স্তরে। এটা ওই সমুদ্রের কয়েক ফোঁটা পানির মতো।”

“বিএনপির দাবি হচ্ছে বড় জায়গায় হাত দিয়ে এর পেছনে কারা আছে, সেগুলো বের করা হোক,” বলেন আলাল।

দুদকের ভূমিকা ও সক্ষমতা সম্পর্কে টিআইবির বক্তব্য সত্য বলে মনে করেন আলাল।

তবে দুদকের অভিযোগ সম্পর্কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান বেনারকে বলেন, “আমরা দুদককে ব্যবহার করছি, এটি অসত্য অভিযোগ। দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সেখানে সরকারের কিছু করার নেই।”

এদিকে টিআইবির অভিযোগকে ‘একদম বোগাস’ মন্তব্য করে দুদকের আইনজীবী খুরশেদ আলম খান বেনারকে বলেন, “এর মধ্যে সারবস্তু বলতে কিছু নেই। তারা কোনো তথ্য উপাত্ত ছাড়াই এমন কথা বলেছেন।”

ক্ষমতাসীন দলের নেতার বাসায় বিপুল টাকা

কারাগারে থাকা ঢাকার গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের নেতা এনামুল হক এনু ও তাঁর ভাই রূপন ভূঁইয়ার সম্পদ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিপুল নগদ টাকার ভাণ্ডার পেয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‍্যাব।

মঙ্গলবার পুরান ঢাকার লালমোহন সাহা স্ট্রিটে মমতাজ ভিলা নামের একটি ছয়তলা বাড়ির নীচতলা থেকে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকাসহ পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত) ও এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে র‍্যাব।

একইসঙ্গে সেখানে নয় হাজারের বেশি ডলারসহ বিভিন্ন দেশের বেশ কিছু মুদ্রা পাওয়া গেছে।

ঘটনাস্থলে র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “এনু আর রূপনই মমতাজ ভিলার মালিক। তবে এত টাকার উৎস কী, কেন এখানে এনে রাখা হয়েছিল, সেসব বিষয় তদন্ত করে জানানো হবে।”

তিনি জানান, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এখানে তল্লাশি করা হয়।

র‍্যাব জানায়, সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ওই বাড়িতে কেউ বসবাস করতেন না। অভিযানের সময়ও সেখানে কেউ ছিলেন না।

এই বাড়িতে কিছু ক্যাসিনোর সরঞ্জামে পাওয়া গেছে, যেগুলোতে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সিল লাগানো ছিল বলে জানান সরোয়ার আলম।

“ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া” কেউ এনু-রূপনের মতো অবৈধ সম্পদ অর্জন করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, “যারা তাদের গডফাদার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। কাউকে এখনো চিহ্নিতই করা হয়নি। হবে বলেও আশাবাদী হতে পারছি না।”

প্রসঙ্গত, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক এনু গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন আর তাঁর ভাই রূপন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে ওয়ান্ডারার্সেও অভিযান চালিয়ে জুয়ার সরঞ্জাম, কয়েক লাখ টাকা ও মদ উদ্ধার করে র‍্যাব।

২৪ সেপ্টেম্বর এনু-রুপনের বাড়ি ও তাঁদের দুই সহযোগীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুকভর্তি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, আট কেজি সোনা এবং ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

গত ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এনু ও রূপনকে।

এই দুই ভাইয়ের নামে ৯১টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে আগে জানিয়েছিল সিআইডি।

পরে মাসব্যাপী তদন্তে দুই ভাইয়ের অবৈধ টাকায় কেনা দেড় শতাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও জমিসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তির হদিস পায় পুলিশ।

দুদকের সমালোচনায় টিআইবি

বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানি করতে সরকার দুদককে ব্যবহার করছে বলে মঙ্গলবার মন্তব্য করে টিআইবি।

নিজেদের গবেষণার বরাত দিয়ে তারা বলছে, নিরপেক্ষ আচরণ দেখাতে ব্যর্থ হওয়া সংস্থটি ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের ব্যাপারে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে।

রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের কার্যালয়ে ‘দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ: বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি ফলো-আপ গবেষণা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বেনারকে বলেন, “এই গবেষণায় আমাদের কাছে মূল যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটি হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদক ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে। আর বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের হয়রানি করতে দুদক ব্যবহৃত হয়েছে।”

“দুদক বলেছে যে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’। কিন্তু তারপরও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিসহ অনেক বৃহৎ আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি,” বলেন তিনি।

প্রকাশিত গবেষণাটির সময়কাল ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বড় বড় আর্থিক দুর্নীতির ব্যাপারে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করে দুদককে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও দুদক তা করেনি। তারা নিজেরাই একটি নো-গো এরিয়া নির্ধারণ করেছে।

বিরোধীদল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “টিআইবি আজকে যা বলেছে, আমরা গত কয়েকবছর ধরে একই কথা বলে আসছি। তারা নতুন কিছু বলেননি।”

“শুধু দুদক কেন, দেশের সকল প্রতিষ্ঠান বিরোধী দলকে শায়েস্তা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে,” বলেন তিনি।

“টিআইবি দুদক নিয়ে যা বলেছে সেটি ভুল নয়। কারণ দুদক চুনোপুটি ধরতে ব্যস্ত। আর ব্যাংক থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়েছে, তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে,” বলেন বদিউল আলম মজুমদার।

তবে দুদকের আইনজীবী খুরশেদ বলেন, “গত কয়েক বছরে যত মামলা করেছি তার ৭০ শতাংশের রায় আমাদের পক্ষে এসেছে; অপরাধী সাজা পেয়েছে। টিআইবি বলুক, যারা সাজা পেয়েছেন তাঁদের কয়জন বিএনপি অথবা বিরোধীদলের নেতা। এভাবে ঢালাও মন্তব্য করা টিআইবির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মানায় না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন