Follow us

জলবায়ু পরিবর্তন অর্থায়নে স্বচ্ছতা নেই: টিআইবি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-08-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা। আগস্ট ২৩, ২০১৭।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা। আগস্ট ২৩, ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের অর্থে বাস্তবায়িত ছয়টি প্রকল্পে ‘সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি’ চিহ্নিত করেছে বার্লিন ভিত্তিক দুর্নীতি বিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন অংশীজনের যোগসাজশকে দায়ী করা হয়।

বুধবার ধানমন্ডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় বেরিয়ে আসা বিভিন্ন অনিয়মের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।

“প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় শুদ্ধাচার চর্চার ক্ষেত্রে দেখা গেছে গবেষণাধীন ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্পই অনুমোদনের সময় বিভিন্ন পর্যায় থেকে সুপারিশ এবং প্রভাব খাটানো হয়েছে বলে তথ্যদাতারা জানিয়েছেন," বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি আরো বলেন, “এর মধ্যে একটি প্রকল্পে জনৈক সচিব, একটি প্রকল্পে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রীর আত্মীয় ও স্থানীয় সংসদ এবং দুটি প্রকল্পে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রভাব খাটিয়েছেন বলে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন।”

তবে ড. ইফতেখার প্রভাব খাটানো ব্যক্তিদের নাম বা প্রকল্পগুলোর নাম উল্লেখ করেননি।

টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ক্লাইমেট ফাইন্যান্স গভর্নেন্স (সিএফজি) ইউনিটের প্রোগ্রাম ম্যানেজার গোলাম মহিউদ্দিন জানান, জরিপে অংশ নেওয়া শতকরা ৯২ ভাগ উত্তরদাতা প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থ বছর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছয়টি প্রকল্পে ৭৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, নদীর তীর সংরক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ, নদী পুনঃখনন, পোল্ডার নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি।

এই সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড জলবায়ু সংক্রান্ত প্রকল্পে মোট ১,১৩২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এই অর্থ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) মোট বরাদ্দকৃত অর্থের শতকরা ৪০ ভাগ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বেনারকে বলেন, আমরা এখনো তাঁদের প্রতিবেদন দেখিনি। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব।”

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বেনারকে বলেন, “রাস্তাঘাটসহ সকল অবকাঠামো নির্মাণের একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে। সেখানে দুর্নীতি থাকা অসম্ভব নয়।”

“তবে এই প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অত্যন্ত গরিব মানুষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকারের উচিত এসব প্রকল্পে যাতে দুর্নীতি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া,” মনে করেন তিনি।

গবেষণা প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে। ঠিকাদারদের কাজের মান নিশ্চিত করা যায়নি এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

পানিসম্পদ খাতের প্রকল্পগুলোতে জন অংশগ্রহণের আইন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পে স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।

আলোচ্য ছয়টি প্রকল্পের কোনোটিতেই জন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। কোনো প্রকল্পেই স্থানীয় প্রকল্প প্রণয়ন বিষয়ক সভা করা হয়নি; প্রকল্পের উপকারভোগী, প্রকল্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কোনো সামাজিক মূল্যায়ন হয়নি।

এ ছাড়া গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পের তদারকিতে স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল না এবং প্রকল্পের কাজের মান সম্পর্কে উপকারভোগীদের মতামত নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রচলিত ই-টেন্ডারিং পদ্ধতিকে একটি আদর্শ ব্যবস্থা মনে করা হলেও এর মাধ্যমে শুধু দরপত্র জমা দেওয়া যায়। দরপত্র মূল্যায়ন ও নির্বাচন পূর্বতন পদ্ধতিতে হওয়ায় স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিতে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ দল এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন বিভাগ কর্তৃক গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পেই পরিবীক্ষণ করা হয়নি।

বিসিসিটিএফ কর্তৃক ৬টি প্রকল্পের শুরুতে ও শেষাংশে কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়েছে, তবে সমাপ্তির পর মূল্যায়ন হয়নি।

কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের কার্যালয়ের নিরীক্ষা দল কর্তৃক গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পেই নিরীক্ষা করা হয়নি। গবেষণায় কার্যকর অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিও চিহ্নিত করা হয়।

অর্থায়নকারী সংস্থা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো আইন/নির্দেশিকায় কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার নির্দেশনা নেই যা জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন “পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত জলবায়ু প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও, সার্বিক বিবেচনায় শুদ্ধাচার, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি লক্ষ করা যায়।

“তথ্যের উন্মুক্ততার ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে এবং প্রকল্পসমূহের গুণগত মানও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি,” বলেন তিনি।

তিনি বাংলাদেশ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে টিআইবি কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশসমূহ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

গবেষণা পদ্ধতি

মার্চ ২০১৫ - জুলাই ২০১৭ সময়কালে পরিচালিত এই গবেষণার পদ্ধতি উল্লেখ করতে গিয়ে গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক জলবায়ু তহবিল ব্যবহারে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করাই এই গবেষণার উদ্দেশ্য।

এই গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) তহবিলের অর্থায়নে বাস্তবায়িত পাউবো-এর ছয়টি জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সকল পর্যায়- প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক বাস্তবায়িত জলবায়ু প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ গবেষণা একটি সামগ্রিক ধারণা দিলেও এর ফলাফল সকল প্রকল্পের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয় বলে জানান মহিউদ্দিন।

এই গুণগত ও পরিমাণগত গবেষণায় তথ্য সংগ্রহে মুখ্য তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার, ফোকাস দলীয় আলোচনা, পর্যবেক্ষণ এবং জরিপ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাথমিক উৎস হিসেবে প্রকল্প পরিচালক, পাউবোর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ঠিকাদার ও মিস্ত্রি, বিসিসিটিএফ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিকট থেকে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।

এ ছাড়া পরোক্ষ উৎস হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি, নীতিমালা, নির্দেশিকা, প্রাসঙ্গিক গবেষণা প্রতিবেদন, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রকল্প প্রস্তাবনা ও ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচিত হয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন