Follow us

নাইকোর সঙ্গে দুটি চুক্তিই অবৈধ: হাইকোর্ট

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-08-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবন। আগস্ট ০২, ২০১৭।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবন। আগস্ট ০২, ২০১৭।
জেসমিন পাপড়ি/বেনারনিউজ

কানাডীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সরকারের করা দুটি চুক্তি হাইকোর্ট ‘অবৈধ ও বাতিল’ ঘোষণা করেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

আদালত আরও বলেন, সুনামগঞ্জের ছাতকের টেংরাটিলায় ২০০৫ সালের বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ আদায় ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ আদায় সংক্রান্ত নিম্ন আদালতে চলমান মামলা দুটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে নাইকোকে কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করা যাবে না।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

নাইকোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স ফেনী ও সুনামগঞ্জ জেলার টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড উন্নয়নের জন্য ২০০৩ সালে এবং পেট্রোবাংলা ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে তোলা গ্যাস কেনার জন্য ২০০৬ সালে চুক্তি করে।

ওই দুই চুক্তির আওতায় নাইকো কানাডা ও নাইকো বাংলাদেশের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ।

“আদালত আজ আদেশে বলেছেন, ২০০৩ ও ২০০৬ সালে নাইকোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি দুটি অবৈধ। তা ছাড়া, আদালত ওই দুই চুক্তির আওতায় নাইকোর সকল সম্পদ জব্দ করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন,” মাহবুবে আলম বলেন।

তিনি বলেন, নাইকো দুর্নীতির মাধ্যমে ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছিল।

‍মাহবুবে আলম বলেন, “আদালতের আদেশ অনুযায়ী টেংরাটিলায় ২০০৫ সালের বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ আদায় ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ আদায় সংক্রান্ত নিম্ন আদালতে চলমান মামলা দুটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার নাইকোকে কোনো অর্থ দিতে পারবে না।"

“আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নাইকোর সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে যাবে,” বলেন আইনজীবি তানজীব-উল আলম।

কীভাবে এল এই আদেশ?

বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স নাইকোর সঙ্গে ফেনী ও সুনামগঞ্জ জেলার টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড উন্নয়নের চুক্তি করে। শুরু থেকেই এই চুক্তিতে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ আসে।

সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেনী গ্যাস ক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে নাইকোর সঙ্গে চুক্তি করা হয়।

গ্যাস খনন করতে গিয়ে ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্রে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। সরকারি হিসেবে, টেংরাটিলা বিস্ফোরণে নাইকোর ‘অবহেলার’ কারণে বাংলাদেশের প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এই ক্ষতির জন্য নাইকো বাংলাদেশকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে নাইকোর সঙ্গে পেট্রোবাংলা ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে তোলা গ্যাস কেনার চুক্তি হয়। এই চুক্তিতেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে।

এই বিতর্কের পর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন পদত্যাগ করেন। সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, নাইকো ঘুষ হিসেবে মোশাররফ হোসেনকে একটি লেক্সাস গাড়ি উপহার এবং তার কানাডা সফরের ব্যয় বহন করে।

এরপর কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম ওই দুই চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৬ সালের মে মাসে জনস্বার্থে এক রিট আবেদন করেন।

ওই রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

সেই সঙ্গে ওই চুক্তি কেন বাতিল করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবং নাইকো কানাডা ও নাইকো বাংলাদেশকে তার জবাব দিতে বলা হয়।

সেই রুলের ওপর শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় দেয় হাই কোর্ট, যাতে চুক্তি অবৈধ ঘোষণা করে নাইকোর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইনজীবী তানজীব-উল আলম রিটকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

আইন অনুযায়ী, নাইকো হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবে।

নাইকোর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার মক্কেল রায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।

এর আগে ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন নাইকো দুর্নীতির জন্য খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে আসামি করে মামলা দায়ের করে।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকোকে কাজ দিতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা এখনো চলছে।

তবে, ২০১০ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাইকো দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, নাইকো বাংলাদেশের সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

“আমরা আদালতের রায়কে সম্মান করে নাইকোকে কোনো অর্থ দেবো না। তাদের সম্পত্তি আমরা জব্দ করব,” জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বেনারকে বলেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন