Follow us

দলের নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর হলেন প্রধানমন্ত্রী

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-09-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ইয়ংমেনস ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারে পর ঢাকার একটি আদালতে হাজির করে র‍্যাব। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
ইয়ংমেনস ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারে পর ঢাকার একটি আদালতে হাজির করে র‍্যাব। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার নয় মাসের মধ্যে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে বিরোধী দল বিএনপির নেতারা এই অভিযানের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এটা আইওয়াশ, কদিন পর থেমে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ থেকে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর ১৩ সেপ্টেম্বর দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে নেতৃত্ব থেকে বহিষ্কার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁদের বদলে ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব ঠিক করে দেন তিনি।

ওই সভায়ই শেখ হাসিনা যুব সংগঠন যুবলীগের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত দেন বলে বেনারকে জানান দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান। তিনি বলেন, দলে দুর্নীতিবাজ নেতা থাকলে তাঁরা রক্ষা পাবেন না।

রাজধানীর গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র, ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ও ওয়ান্ডারার্স এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবের জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে গত বুধবার রাতে সেগুলো সিলগালা করে দেয় র‍্যাব। চারটি ক্যাসিনো থেকে গ্রেপ্তার করা ১৮২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

এর মধ্যে ইয়ংমেনস ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারে পর বৃহস্পতিবার সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীতে ক্লাবে বা আড্ডায় জুয়ার আসরের কথা শোনা গেলেও আধুনিক ক্যাসিনোর অস্তিত্ব থাকার খবর একেবারেই নতুন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তত ৫৬টি ক্যাসিনোর তালিকা তাঁদের হাতে আছে। এসব ক্যাসিনোর বেশির ভাগই চালান সরকারি সংগঠনের একশ্রেণির নেতা।

ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি: প্রধানমন্ত্রী

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। সমাজের অসংগতি এখন দূর করব। একে একে এসব ধরতে হবে। জানি কঠিন কাজ, কিন্তু আমি করব।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস বিভাগের পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এ বক্তব্য সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে গতকাল বিকেলে ছাত্রলীগ নেতারা সাক্ষাৎ করতে গেলে এসব কথা বলেন তিনি।

এক দশকের মাথায় কঠোরতা

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথমবার দলীয় নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করল আওয়ামী লীগ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে অন্যায় করবে, আইন ভঙ্গ করবে, দুর্নীতি করবে তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেবেন না; তারা যে দলের লোক হোক না কেন। দলের লোক অপরাধ করলে ছাড় পাবে, সেটা ঠিক নয়।”

তিনি বলেন, “গতকাল যে ক্যাসিনোতে অপারেশন চালানো হয়েছে সেটি অনুমতি ছাড়াই চালানো হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে অভিযান চালানো হযেছে। আমরা দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এর আগে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি অবৈধ ক্যাসিনো ধ্বংস করি।”

মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এগুলোর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কোনো আপস করবেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া সাম্প্রতিক ব্যবস্থা নিজ সাংগঠনের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান কি না সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে সরকার দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে। ২০০৯ সালের পর থেকে আমরা এমন ব্যবস্থা দেখিনি।”

তিনি বলেন, “জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতা কর্মীদের যারা দুর্নীতি করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দেখতে চায়।”

ড. নিজাম বলেন, তবে সার্বিকভাবে বলা যায় সরকার তার দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে, যদিও অনেকে এটাতে ‘প্রতীকী’ বলছেন।

দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ শাখার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেফারুজ্জামান বেনারকে বলেন, “ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে গৃহীত সাম্প্রতিক ব্যবস্থা যেমন নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা, গ্রেপ্তার করা, এগুলোকে যদি শুদ্ধি অভিযান বলা হয় তাহলে সেটিকে সফল করতে চাইলে কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নিলে চলবে না।”

তিনি বলেন, “এটি যদি কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করে করা হয় তাহলে কোনো লাভ হবে না। হয়তো আলোচনা হবে। আবার বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে। এ সকল সংগঠনের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির সাথে আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

ড. ইফতেখার বলেন, ক্ষমতাসীন দলে অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে। এগুলো ধ্বংস করতে হলে একটি সামগ্রিক শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। সংগঠনগুলোর মধ্যে যে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটি বন্ধ করতে হবে।”

তিনি বলেন, “আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো যে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের রোল মডেল পেয়েছে সেগুলো তাঁদের মূল রাজনৈতিক সংগঠনগুলো থেকে। শুধু ক্ষমতাসীন দল নয় বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা বন্ধ করতে হবে।”

বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এগুলোর কারণ হলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির সমস্যা। এটি দুর্নীতের বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত ব্যবস্থা নয়। এটি কোনো শুদ্ধি অভিযান নয়।”

তিনি বলেন, “সারা বাংলাদেশে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো লুট করছে। যেসব নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাদের কিছু হবে না। তারা আবার বহাল তবিয়তে থাকবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন