Follow us

২৮ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ইসলামই রাষ্ট্রধর্ম

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016-03-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের উচ্ছ্বাস। ২৮ মার্চ ২০১৬।
ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের উচ্ছ্বাস। ২৮ মার্চ ২০১৬।
এএফপি

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মকে অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ২৮ বছর আগে দায়ের করা একটি আলোচিত রিট খারিজ করে দিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত। এ নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সেই অর্থে কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলেও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো বেজায় খুশি হয়েছে।

সোমবার বিচারপতি নাঈমা হায়দার, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি করে এই রায় দেন। এর ফলে ইসলামই বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল থাকছে।

এদিকে রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ক রিট আবেদনের শুনানির প্রেক্ষাপটে সোমবার হরতাল পালন করে জামায়াতে ইসলামী। ওই রিট আবেদনকে ‘দেশকে ধর্মহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত’ বলেও আখ্যায়িত করে তারা।

রায়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল না থাকলে দেশ অচল করার হুমকি দিয়েছিল কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এ বিষয়ে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশ ইসলামি আন্দোলনসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোও।

১৯৮৮ সালের ৫ জুন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংযুক্ত করেন স্বৈরাচার হিসেবে পরিচিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সংবিধানে ২ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে।

স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে ১৫ জন বরেণ্য ব্যক্তি রিট আবেদন করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে নানা ধর্মবিশ্বাসের মানুষ বাস করে। সেখানে একটি ধর্মকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করার সিদ্ধান্ত সংবিধান ও বাংলাদেশের অভিন্ন জাতীয় চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে শুনানিতে সাংবিধানিক আলোচনা পর্যন্ত আলোচনা পৌঁছায়নি। স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির রিট আবেদন করার ‘এখতিয়ার নেই’ মর্মে তাদের আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

জীবিত আবেদনকারীদের মধ্যে এ রায় নিয়ে কেউই মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী ও  আইনজীবী জগলুল হায়দার আফ্রিক আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা।

‘এখতিয়ার নেই, রিট খারিজ’

সোমবার রিটটির শুনানি থাকার কথা থাকলেও শুনানির আগেই রিটটি খারিজ করে দেন আদালত।

শুনানির শুরুতেই ২৮ বছর আগের রিট আবেদন প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে রিট আবেদনটি করা হয়। সম্পূরক আবেদনে রুল হয় ২০১১ সালে । এর শুনানির জন্য আমাদের সময় দরকার।”

তবে আদালত শুরুতেই আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনতে চান। তখন সাবেক বিচারপতি টিএইচ খান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবিএম নুরুল ইসলাম এই রিট মামলায় বিবাদী পক্ষে পক্ষভুক্ত হতে আদালতের কাছে আবেদন জানান। তবে আদালত এ সময় আগে রিট আবেদনকারীর আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পর পক্ষভুক্ত হওয়ার বিষয় বিবেচনা করার কথা বলেন।

এরপরেই রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী সুব্রত চৌধুরীকে আদালত বলেন, “আপনাকে আমরা দেখে আসতে বলেছিলাম ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির’ পক্ষে রিট করার এখতিয়ার ছিল কি না?”

ওই কমিটি ছাড়াও প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে আবেদনকারী হয়েছিলেন বলে জবাবে আদালতকে জানান সুব্রত চৌধুরী। তবে আদালত বলেন, “আমরা দেখছি কমিটির পক্ষে রিট আবেদনটি করা হয়েছে।”

এ বিষয়ে শুনানির সময় আমরা বিস্তারিত বলবেন বলে জানান সুব্রত চৌধুরী। কিন্তু শেষমেশ শুনানি পর্যন্ত না গিয়ে আদালত বলেন, “কমিটির রিট আবেদন করার এখতিয়ার নাই। রিট রিজেক্টেড (খারিজ), রুল ডিসচার্জড’।

আবেদনকারীরা কে, কোথায়

২৮ বছর আগে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে রিটকারীদের ১৫ বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শরাফী, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ মারা গেছেন।

জীবিত পাঁচজন হলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেক্টর কমান্ডার সি আর দত্ত, লেখক বদরুদ্দীন উমর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

তবে তাঁরাও রিটটি বিষয়ে এখন কথা বলতে রাজি নন।

জীবিতদের মধ্যে সি আর দত্ত ভীষণ অসুস্থ। আর এ রিট থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন বদরুদ্দীন উমর। অন্যরাও বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান।

রিট খারিজের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বেনারকে বলেন, “আমি ওই রায় সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। আমরা ১৫জন মিলে রিট আবেদন করেছিলাম, যাদের ১০ জন মারা গেছেন। বাকিদের মধ্যে সি আর দত্ত মৃত্যুশয্যায়, বদরুদ্দিন উমর প্রত্যাহার করেছেন। আমি এ নিয়ে এখন আর কিছু বলতে চাই না।”

রিট আবেদনটির ২৩ বছর পর ২০১১ সালের ৮ জুন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে রুল দেন। ওই দিন এ মামলায় আদালতের আইনি সহায়তাকারী ( অ্যামিকাস কিউরি) হিসেবে ১৪ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর নাম ঘোষণা করা হয়।

তাঁরা হলেন; টি এইচ খান, কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, এম জহির, মাহমুদুল ইসলাম, এ এফ হাসান আরিফ, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আখতার ইমাম, ফিদা এম কামাল, আজমালুল হোসেন কিউসি, আবদুল মতিন খসরু, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এবং এ এফ এম মেসবাহ উদ্দিন। পরে এদের মধ্যে এম জহির ও মাহমুদুল ইসলাম মারা গেছেন।

ওই রুল জারির প্রায় পাঁচ বছর পর এ বছরের ৮ মার্চ এই রুলটি শুনানির জন্য আদালতে ওঠে। অ্যামিকাস কিউরিদের বাদ দিয়ে ওই দিন আদালত শুনানির জন্য ২৮ মার্চ তারিখ ধার্য করেন।

স্বাগত জানিয়েছে ইসলামী দলগুলো

সোমবার রিটটি খারিজের রায় আসার পর নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ইসলামি দলগুলো এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। রায়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বৈধ ও বহাল থাকায় হরতাল প্রত্যাহার করে নেয় জামায়াতে ইসলামী।

সোমবার বিকেলে হরতাল চলাকালে দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, “আজকের এই ঐতিহাসিক বিজয় নির্দিষ্ট কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়। এ দেশের ১৬ কোটি মানুষেরই বিজয়।”

এতে বলা হয়, “জামায়াতে ইসলামী ইমান ও ইসলাম রক্ষা এবং দেশ ও জাতির প্রয়োজনে অন্যায়ের কাছে মাথানত করবে না। দেশ এবং জাতির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আপসহীন ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সর্বাত্মক সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।”

অন্যান্য ইসলামি দলগুলোও এ রায়ের সন্তোষ প্রকাশ করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ

অন্যদিকে ভিন্ন মতামতও প্রকাশ পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমিনুল রাসেল নামে একজন লিখেছেন- “…আমার নিজস্ব বিবেচনায় রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকে না।”

রেজা শাহরিয়ার নামে আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ সম্ভব নয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করার মধ্যদিয়ে সামরিক জান্তা স্বৈরাচারী এরশাদ বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিদের নিরাপদ চারণভূমি তৈরি করেছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন রিট আবেদনের শুনানির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। মিল্টন আনোয়ার নামের একজন সাংবাদিক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আক্ষেপ করে লিখেছেন “দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করতে পারেন কী না সেই সিদ্ধান্ত নিতে সর্বোচ্চ আদালত ২৮ বছর লাগিয়ে দিল।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন