Follow us

নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতম বিচারপতির পদত্যাগ

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-02-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবন। ফাইল ফটো।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবন। ফাইল ফটো।
নিউজরুম ফটো

সব জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রধান বিচারপতি পদে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশের ২১ তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পদত্যাগপত্র দেওয়ার ৮৫ দিনের দিনের মাথায় শুক্রবার ২২ তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলো।

নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মাথায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা পদত্যাগ করেছেন। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করায় তিনি পদত্যাগ করেন। বিচারপতি পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে গতকাল শুক্রবার রাতে বঙ্গভবন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গত প্রায় চার মাস জুড়ে প্রধান বিচারপতি পদ ঘিরে নাটকীয় ঘটনা ঘটছে। প্রথমে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ছুটিতে যাওয়া, পরে ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে বিদেশ যাওয়া, এরপর পদত্যাগ পাঠানোর ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ আদালত।

নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। ফাইল ছবি। [বেনারনিউজ]
নতুন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। ফাইল ছবি। বেনারনিউজ
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন বেনারকে বলেন, “শুক্রবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির নিয়োগসংক্রান্ত পত্রে স্বাক্ষর করেন। শনিবার সন্ধ্যা সাতটায় বঙ্গভবনে প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেবেন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।”

আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা এই চার মাস দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি হিসেবে কার্যভার পালন করে আসছিলেন। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার চাকরির মেয়াদ আছে চলতি বছরের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত।

আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের প্রথা রয়েছে। জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্যে মাহমুদ হোসেন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। তাই মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

তবে এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। আর জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের নজির এটাই প্রথম নয়। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেনারকে বলেন, “প্রধান বিচারপতি নিয়োগের এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপতির। এ ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের যেকোনো বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।”

“জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিচারপতি নিয়োগের অভিযোগ এখানে অমূলক। কারণ, সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিজ বিবেচনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার ক্ষমতা রাখেন। তাই এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি,” বেনারকে বলেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।

তবে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও প্রথা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা বজায় রেখে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিলে সরকারের স্বচ্ছতা আরও প্রকাশ পেত বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।

তিনি বেনারকে বলেন, “সরকার তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী এই নিয়োগ দিয়েছে। তবে আমরা আশা করেছিলাম জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ হবে। কারণ বর্তমানে জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি ওহাব সাহেবের চাকরির মেয়াদ অল্প দিন আছে। এই অল্প সময়ের জন্য জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন না করলেও চলত।”

খন্দকার মাহবুব বলেন, “তবে এই নিয়োগে বিচার বিভাগের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করি। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি স্বচ্ছ, সজ্জন ব্যক্তি। আশা করব, মানুষ যাতে ন্যায় বিচার পায় তিনি সেই ব্যবস্থা নেবেন।”

পৃথিবীর কোনো দেশে গুরুত্বপূর্ণ এই পদ এত দিন খালি থাকে না বলে উল্লেখ করে এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, একজন প্রধান বিচারপতি পাওয়া গেছে এটাই যথেষ্ঠ।

জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে বর্তমানে আপিল বিভাগে দায়িত্বরত পাঁচজন বিচারপতি হলেন যথাক্রমে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

এদের মধ্যে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের চাকরির মেয়াদ রয়েছে ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তিনি এর আগে দুইবার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

তৃতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এ ছাড়া বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আগামী ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আর বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ২০২১ সালে অবসরে যাবেন।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর গত বছরের ২ অক্টোবর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রথমে এক মাসের ছুটিতে যান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এরই প্রেক্ষিতে তিনি পুনরায় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দেন জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞাকে।

পরে ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে গত ১৩ অক্টোবর বিদেশে যান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ছুটিতে থাকা অবস্থাতেই গত বছরের ১০ নভেম্বর কানাডা যাওয়ার পথে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন আলোচিত এই প্রধান বিচারপতি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনা। গত বছরের ১৪ নভেম্বর তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এখনো বিদেশে অবস্থান করছেন, যদিও তাঁর স্ত্রী সুষমা সিনহা দেশেই রয়েছেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন