Follow us

আকস্মিক ছুটিতে প্রধান বিচারপতি

পুলক ঘটক
ঢাকা
2017-10-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গণভবনে যান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৭।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গণভবনে যান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৭।
ফোকাস বাংলা

দীর্ঘ অবকাশের পর মঙ্গলবার আদালত শুরু হলেও এজলাসে থাকছেন না প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। একটি রায়ের পর চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা প্রধান বিচারপতি আকস্মিকভাবে আবার এক মাসের ছুটি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে সোমবার বেনারকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

“বিচারপতি সিনহা অসুস্থতার কারণে একমাসের ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি নিজের ছুটি নিজেই মঞ্জুর করেন,” বেনারকে বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

এদিকে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নেতারা সোমবার বিকেলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁদের প্রধান বিচারপতির বাসভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে বেনারকে জানিয়েছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন।

প্রধান বিচারপতি ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশ সফরে ছিলেন। অসুস্থ মেয়েকে দেখতে প্রথমে কানাডায় যান তিনি। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি গত ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডা থেকে জাপান যান।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন এবং ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে এ সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে।

এর মধ্যে ২৭ আগস্ট থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি ছিল। এক মাস পর মঙ্গলবার থেকে নিয়মিত আদালত বসবে।

আদালত খোলার পরই বিচারপতি সিনহাকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা।

তার আগেই মঙ্গলবার থেকে বিচারপতি সিনহার ছুটির ঘটনাটি প্রকাশ পেল।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি

প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাবার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

“যেহেতু তিনি ছুটির আগ্রহ জানিয়ে আমাদের চিঠি দিয়েছেন, সেহেতু একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতি একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন,” তিনি জানান।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেনারকে বলেন, “অসুস্থতার কারণে প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যাচ্ছেন বলে শুনেছি। সেক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওহাব মিয়া প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”

সরকারের দিক থেকে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার কথা বলা হলেও প্রধান বিচারপতির দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে মুখ খুলছেন না সুপ্রীম কোর্টের রেজিষ্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

রেজিষ্ট্রার সাব্বির ফয়েজকে বেনারের পক্ষ থেকে বহুবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সরকারের সাথে বিরোধ

বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ।

রায়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন ও সংসদ এবং সামরিক শাসন নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ দেন প্রধান বিচারপতি।

গত ১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে থাকেন সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কর্তা ব্যক্তিরা।

তাঁদের অভিযোগ, রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সংসদ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে খাটো করেছেন প্রধান বিচারপতি।

এরপর প্রকাশ্যেই প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করেন সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যরা।

অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার আমলে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনার এই রায়কে স্বাগত জানায় বিএনপি।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং তার কিছু পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

ওই প্রস্তাব পাসের আগে সংসদে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আদালত তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সংসদে আনা সংবিধান সংশোধন বাতিলের এই রায় দিয়েছে।

‘সংসদ ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে’ এই রায় দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সরকার প্রধান।

সরকার সমর্থিত বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

তাঁদের দাবি ছিল, অবকাশ শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে হবে। প্রধান বিচারপতি অবশেষে ছুটিতে যাওয়াকে এসব ঘটনার ধারাবাহিকতার ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, বিচারপতি সিনহার চাকরির আরও তিন মাস বাকি আছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রয়েছে তাঁর চাকরির মেয়াদ।

‘প্রশ্নবিদ্ধ ছুটি’

এদিকে প্রধান বিচারপতির আকস্মিক ছুটিতে যাওয়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নেতারা।

“প্রধান বিচারপতির এই ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। আমরা বুঝতে পারছি তিনি অসুস্থ নন। তিনি ছুটি শেষ করে চলে এসেছেন। আজ তিনি দুপুর পর্যন্ত অফিস করেছেন,” বেনারকে বলেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন।

বাস্তব অবস্থা বোঝার জন্য সোমবার বিকেলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাসভবনের সামনে গিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। তবে তাঁদের প্রধান বিচারপতির বাসভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে বেনারকে জানান মাহবুব উদ্দিন খোকন।

তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতির বাসভবনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি সুস্থ আছেন। তবে তিনি এই মুহূর্তে কথা বলতে পারবেন না।”

এর আগে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র সঙ্গে আইনজীবীদের সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিরা চলমান অবকাশকালীন ছুটির পর প্রথম কার্যদিবস ০৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সাড়ে দশটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত মূল ভবনের ভেতরের লনে অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক এবং আইনজীবীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন।”

“সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষে আগামীকাল তাঁর সঙ্গে আমাদের সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হওয়ার কথা ছিল। এই অবস্থায় ছুটির বার্তা প্রশ্নবিদ্ধ,” বলেন মাহবুব উদ্দিন খোকন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণের জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি জরুরি সভা ডেকেছে বলেও জানান খোকন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন