Follow us

প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে বিশৃঙ্খল বাংলাদেশের বিচার বিভাগ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-10-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
উচ্চ আদালতে নৈরাজ্য সৃষ্টি, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ ও প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানোর প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের মানববন্ধন। ৯ অক্টোবর ২০১৭।
উচ্চ আদালতে নৈরাজ্য সৃষ্টি, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ ও প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানোর প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের মানববন্ধন। ৯ অক্টোবর ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে দেশের বিচার বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ছুটি নিয়ে বিদেশ গমন, তাঁর কর্মকাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতিদের অসন্তোষ প্রকাশ এবং সরকারের দিক থেকে আনা দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে এই পরিস্থিতির সৃষ্ট হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে এস কে সিনহা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি অসুস্থ না। আমি ভালো আছি। আমি পালিয়েও যাচ্ছি না। আমি আবার ফিরে আসব।”

এর একদিন পর গত রোববার সুপ্রিম কোর্ট এক বিবৃতিতে জানায়, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছ থেকে প্রধান বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ-পাচারসহ ১১টি অভিযোগ এসেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের পাঁচজন বিচারক তাঁর সঙ্গে বিচারিক কাজ করবেন না বলে জানিয়েছেন।

একই দিন আইন মন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির তদন্ত করতে পারে দুর্নীতি দমন কমিশন।

দেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা, যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আসল এবং তা সংবাদমাধ্যমে জানানো হলো।

“যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই অ্যান্টি করাপশন কমিশনের আওতায়,” বেনারকে বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, “এই যে অভিযোগ তা অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধানে যদি সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে মামলা হবে।”

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, “অভিযোগ যেহেতু উঠেছে তাই অনুসন্ধান করতে হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কারণ কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনসহ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সংবিধানে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের কথা বলা আছে।

তবে গত রোববার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বেনারকে বলেন, “সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এখন আর নেই।”

সরকারের তরফ থেকে ওই অভিযোগ দুদকে পাঠানো হবে কি না, এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, “দুদকে পাঠানোর আইন আছে, নিয়ম আছে এবং দুদক নিজেদের উদ্যোগেও তদন্ত করতে পারে। তবুও দুদকে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করব।”

“আইন অনুযায়ী দুদক একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সকল নাগরিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করতে পারবে। আবার সুপ্রিম কোর্ট যদি দুদককে তদন্ত করতে আহ্বান জানায় সে ক্ষেত্রেও তদন্ত করা যাবে,” বেনারকে বলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান।

প্রধান বিচারপতির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে দেওয়া বিবৃতি প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেনারকে বলেন, ‘‘এই বিবৃতি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল এইজন্য যে প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে নাটকীয়তার সৃষ্টি করেছেন এবং লিখিত একটি বিবৃতি সাংবাদিকদের দিয়ে গেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশবাসীকে অন্তত সত্য কথাগুলো জানানোর প্রয়োজন ছিল।”

মাহবুবে আলমের মতে, প্রধান বিচারপতি ফিরে আসার পর অন্যান্য বিচারপতিরা তাঁর সঙ্গে বসতে চাইলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। সেটা তো অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তিনি বলেন, ‘‘কাজেই বিদেশ থেকে ফিরে এসে ওনার দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি সুদূর পরাহত বলে মনে হয়।”

ভিন্ন মত

পুরো বিষয়টিকে বিচার বিভাগের সঙ্গে সংসদ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্বের ফল বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান।

তিনি বেনারকে বলেন, ‘‘প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ-কোনো কিছুই ভালো ফল বয়ে আনবে না। কারণ পুরো বিষয়টি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে।”

“ইতিমধ্যে বিচার ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে সেটার প্রভাব নিম্ন আদালতেও পড়ে। এ অবস্থায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নষ্ট হতে পারে,” বেনারকে বলেন ড. আতাউর।

সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতি

গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ১৩ অক্টোবর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে একটি লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। ওই লিখিত বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছাড়া আপিল বিভাগের অন্য পাঁচ বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান, যেখানে বিচারপতি মো. ইমান আলী দেশের বাইরে থাকায় তিনি ছাড়া অন্য চারজন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ওই সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ-সংবলিত দালিলিক তথ্যাদি বিচারপতিদের কাছে হস্তান্তর করেন। যার মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরও সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, ১ অক্টোবর পাঁচ বিচারপতি প্রধান বিচারপতির বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করে অভিযোগগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন। আলোচনার পর তাঁর কাছ থেকে গ্রহণযোগ্য সদুত্তর না পেয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তাঁকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাঁদের (পাঁচ বিচারপতি) পক্ষে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

এদিকে কোন প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট বিবৃতি দিয়েছিল, তা হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবহিত করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। গতকাল সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত ফুল কোর্ট সভায় তিনি বিষয়টি অবহিত করেন।

এই সভায় সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিরা অংশ নেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন