Follow us

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-11-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
অস্ট্রেলিয়া যাত্রার আগে ঢাকায় সরকারি বাসভবনের সামনে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। ১৩ অক্টোবর ২০১৭।
অস্ট্রেলিয়া যাত্রার আগে ঢাকায় সরকারি বাসভবনের সামনে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। ১৩ অক্টোবর ২০১৭।
মনিরুল আলম/বেনারনিউজ

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিযোগ করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিচারপতি সিনহাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

তবে সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বোচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সহকর্মী বিচারকেরা তাঁর সঙ্গে এক বেঞ্চে বসতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

এর আগে সুপ্রিম কোর্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে।

গত ১৩ অক্টোবর বিচারপতি সিনহা অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার পরদিন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে ওই বিবৃতি পাঠানো হয়েছিল।

“প্রধান বিচারপতি সিনহাকে অসুস্থ বানিয়ে সরকার তাকে জোর করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু বিদেশে পাঠিয়েই শেষ নয়, সরকার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনকে বিদেশে পাঠিয়েছে। তিনি দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ফিরতে দেওয়া হয় নাই,” বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রবিবার এক জনসভায় এ কথা বলেন।

“সিনহা কিছু সত্য কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন নিম্ন আদালত সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার এখন উচ্চ আদালতও নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে,” বলেন খালেদা।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আইনের শাসনের ওপর কালো হাতের থাবা পড়েছে। ঘটনা পরিক্রমায় প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছে।”

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের কারণেই প্রধান বিচারপতিকে বিদায় নিতে হয়েছে অভিযোগ করে আইনজীবীদের এই শীর্ষ নেতা বলেন, “অতীতে কখনোই এভাবে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়নি।”

‘পদত্যাগের পেছনে সরকারের হাত নেই’

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ১০ নভেম্বর তাঁর ছুটি শেষ হওয়ার দিন পদত্যাগ করেছেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আব্দুল হামিদের প্রেস সচিব জয়নাল আবেদিন।

তিনি বেনারকে বলেন, “বিচারপতি সিনহা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। ১০ নভেম্বর তাঁর ছুটির মেয়াদ শেষ হয়।”

“বিচারপতি সিনহা অস্ট্রেলিয়া থেকে কানাডা যাচ্ছিলেন। পথে তিনি সিঙ্গাপুরে যাত্রা বিরতি করেন। তিনি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন,” বলেন তিনি।

হাইকমিশনার পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর পদত্যাগপত্রটি বাংলাদেশ বিমানের ফিরতি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে পাঠান বলে জানান তিনি।

এদিকে “প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের পেছনে সরকারের কোনো হাত নেই,” মন্তব্য করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বেনারকে বলেন “বিরোধী দল সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট প্রধান বিচারপতির দুর্নীতি ও অসদাচরণের ব্যাপারে বিবৃতি দিয়েছে। তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের কোনো সম্পর্ক নেই।”

জয়নাল আবেদিন বলেন, “প্রধান বিচারপতি চাইলে দেশে ফিরে আবার কাজে যোগ দিতে পারতেন। তার পরিবর্তে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।”

“প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে - বিরোধী দলের এ রকম অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে ভুল,” বলেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব।

‘বিচার বিভাগের জন্য একটি কালো অধ্যায়’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেছেন, “দুর্নীতির অভিযোগসহ প্রধান বিচারপতি সিনহার এই পদত্যাগে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।”

তবে এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বেনারকে বলেন, “প্রশ্ন হলো সরকার যে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের কথা বলছে সেগুলো কি সঠিক? যদি সঠিক না হয়ে থাকে তাহলে তিনি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করলেন না কেন?”

“অতীতে কখনোই কোনো প্রধান বিচারপতি দুর্নীতির অভিযোগে পড়েননি এবং পদত্যাগ করেননি। আসলে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় নিয়ে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে তার ঝামেলা চলছিল,” বেনারকে বলেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আমলাতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছিলেন বিচারপতি সিনহা। তাঁর বিদায় বিচার বিভাগকে আমলাতন্ত্রের করায়ত্বে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এটা দেশের রাজনীতি এবং বিচার বিভাগের জন্য একটি কালো অধ্যায়।”

তাঁর আশঙ্কা এতে “নিম্ন আদালত নির্বাহী বিভাগের দ্বারা প্রভাবিত হবে।”

তবে “দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের মাঝে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা পদত্যাগ করায় এর বহুমাত্রিক প্রভাব আছে,” স্বীকার করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।

তিনি বলেন, “দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক হলে অন্যদের কাছে বার্তা যাবে যে যত বড়ই হোক দুর্নীতি করলে তাদেরকে এ রকম পরিণতি বরণ করতে হবে। তবে এটা সত্য, এসকে সিনহার পদত্যাগ বিচার বিভাগকে নড়বড়ে করে দিয়েছে,” বলেন সাবেক এই আইনমন্ত্রী।

“নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণেই প্রধান বিচারপতি সিনহাকে বিদায় নিতে হয়েছে। তিনি যদি সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে না যেতেন, তাহলে তার কিছুই হতো না,” বেনারকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আতাউর রহমান।

সরকারের সাথে বিরোধ

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত করার পর থেকেই প্রধান বিচারপতির সরকারের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অবস্থার তৈরি হয়।

জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে এই দ্বন্দ্ব তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেন। প্রধান বিচারপতি ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে হেয় করেছেন বলে অভিযোগ আনেন তাঁরা।

স্বাভাবিক নিয়মে বিচারপতি সিনহা অবসরে যাওয়ার কথা আগামী ছিল ৩১ জানুয়ারি। কিন্তু তার আগেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।

“এসকে সিনহার সহকর্মী বিচারকেরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে রাজি না হওয়ার কারণেই পদত্যাগ করেছেন। এতে সরকারের কিছু করার ছিল না,” বেনারকে বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন