শিশুদের করোনাভাইরাস টিকা দেয়া শুরু, পর্যায়ক্রমে পাবে সবাই

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2021-10-14
Share
শিশুদের করোনাভাইরাস টিকা দেয়া শুরু, পর্যায়ক্রমে পাবে সবাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের (পেছনের সারি, ডান থেকে দ্বিতীয়) উপস্থিতিতে মানিকগঞ্জ কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাস টিকা নেবার সময় বিজয়চিহ্ন দেখাচ্ছে এক শিশুগ্রহিতা। ১৪ অক্টোবর ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ১২ থেকে ১৭ বছরের শিশুদের করোনাভাইরাস টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, পর্যায়ক্রমে এই বয়সের সব শিশু টিকার আওতায় আসবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১২ জন শিক্ষার্থীকে ফাইজারের তৈরি করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ সদর আসনের সাংসদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

টিকা নেয়ার পর এই শিশুদের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না তা কিছুদিন পর্যবেক্ষণের পর আগামী সপ্তাহ থেকে দেড় কোটি শিশুকে পর্যায়ক্রমে ফাইজারের টিকা দেয়া হবে বলে বৃহস্পতিবার বেনারকে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

তবে তাঁর মতে, এত সংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়া সরকারের জন্য এক ‘বড়ো চ্যালেঞ্জ।’

“মানিকগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৫৬ জন মেয়ে এবং ৫৬ জন ছেলেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে” টিকা দেওয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানান জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন লুৎফর রহমান।

“আমরা প্রত্যেক অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ রেখেছি। সব ছেলেমেয়ে ভালো আছে। আগামী দুই-তিন দিন এসব ছেলে-মেয়েদের পর্যবেক্ষণে রাখব,” বলেন সিভিল সার্জন। 

টিকা নেয়া নবম শ্রেণির ছাত্রী আঁচল আক্তারের (১৫) মা সাহিদা আক্তার বৃহস্পতিবার রাতে বেনারকে জানান, টিকা নেবার পর আঁচল ভালো আছে। “কোনো সমস্যা হয়নি। আমি আজকে তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছিলাম। কিন্তু সে যথারীতি লেখাপড়া করছে।” 

ফাইজারের টিকা দেয়া চ্যালেঞ্জের ব্যাপার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজের জেলা থেকে শিশুদের করোনার টিকাদান শুরু করার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বেনারকে বলেন, “টিকা নেয়া শিশুদের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি না, তা পর্যবেক্ষণের পর আগামী সপ্তাহের মধ্যে সারা দেশে ১২ থেকে ১৭ বছরের সকল শিশুকে টিকা দেয়া শুরু করব।”

“আমরা হিসাব করে দেখেছি, ১২ থেকে ১৭ বছরের দেড় কোটি শিক্ষার্থীর জন্য তিন কোটি টিকা প্রয়োজন। আমাদের হাতে আছে ৬০ লাখ টিকা। এই মাসেই আসবে আরও ৭০ লাখ টিকা,” বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

“টিকা পাওয়ার চ্যালেঞ্জ তো আছে। তবে আমরা সংগ্রহ করতে পারব,” জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “ফাইজারের টিকা দেয়াও চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।” এই টিকা “মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়” সংরক্ষণ করতে হয়। 

তবে এই টিকার জন্য “প্রথম পর্যায়ে ঢাকাসহ সারাদেশের ২১টি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ১২ থেকে ১৭ বছরের সব শিশুকে এই টিকা দেয়া হবে,” বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

এদিকে শিশুরা স্কুলে যাওয়া শুরু করলেও টিকা দেবার সুযোগ না থাকায় “অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় আছেন,” বলে বেনারকে জানান সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মোশতাক হোসেন।

এই পরিস্থিতিতে টিকাদান শুরু হওয়াকে “ভালো দিক” আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, “তবে এই টিকাদান প্রক্রিয়ায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত ফাইজার ছাড়া অন্য কোনো টিকা বাচ্চাদের দেয়ার অনুমোদন দেয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “ফাইজার টিকার মান রক্ষার জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রা রক্ষা করতে হয়।”

“প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকার মান রক্ষা করা। গ্রামাঞ্চলে এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে টিকার মান রক্ষা করা কঠিন। আমাদের সরকারি পর্যায়ে এতো সংখ্যক ফ্রিজারভ্যান নেই,” বলেন মোশতাক হোসেন।

আবার অনেক গ্রামে ভালো সড়কপথ না থাকায় ফ্রিজারভ্যান নিয়ে যাওয়াও সমস্যা বলে জানান তিনি।

এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের হাতে থাকা ফাইজারের ৬০ লাখ টিকা দিয়ে মাত্র ৩০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের শিশুর সংখ্যা কোটির বেশি। যদিও টিকা আসা একটি চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু টিকা যে পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।”

তিনি বলেন, “ত্রিশ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হলে রাজধানীসহ বিভিন্ন বড়ো শহরের বাচ্চারা পাবে। অন্যান্য এলাকার বাচ্চারা পাবে না।”

“সব বাচ্চাদের দেয়া না গেলে সবাই নিরাপদ হবে না,” যোগ করেন ডা. মোশতাক হোসেন।

বাংলাদেশকে করোনা মহামারি থেকে রক্ষা করতে কমপক্ষে ৮০ ভাগ মানুষকে টিকা দিতে হবে জানিয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম আলমগীর বেনারকে বলেন, “বাচ্চাদের টিকা দেয়া না হলে আমরা ৮০ ভাগের লক্ষ্য পূরণ করতে পারব না।”

সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন ফরম দিয়ে টিকার জন্য শিশুরা নিবন্ধন করতে পারবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শতকরা ২৫ ভাগের বেশি মানুষকে করোনাভাইরাসের প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে।

বাচ্চাদের টিকা দেয়া শুরু একটি “ভালো সিদ্ধান্ত” উল্লেখ করে নওগাঁ শহরের বাসিন্দা এবং অভিভাবক বায়েজিদ হোসেন বেনারকে বলেন, “কারণ বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হবে। বাসায় লেখাপড়া হয় না এটি প্রমাণ হয়ে গেছে। স্কুলে না গিয়ে বাচ্চাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।”

“তবে সারা দেশের সকল শিশু যাতে টিকা পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শহরাঞ্চলের বাইরে শিশুরা যেন বঞ্চিত না হয় সেব্যাপারে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে,” বলেন তিনি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন