Follow us

কারাগারে অগ্নিদগ্ধ হয়ে আইনজীবীর মৃত্যু: বিচারিক তদন্তের নির্দেশ

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-05-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নিজ বাড়িতে সহোদরদের সাথে পলাশ (চশমা পরা)।
নিজ বাড়িতে সহোদরদের সাথে পলাশ (চশমা পরা)।
[ছবি: পরিবারের সৌজন্যে]

পঞ্চগড় জেলা কারাগারে অগ্নিদগ্ধ আইনজীবী ও সংখ্যালঘু নেতা পলাশ কুমার রায়ের (৩৬) মৃত্যুর ঘটনা বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। জনস্বার্থে দায়ের হওয়া রিটের শুনানি শেষে বুধবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।

রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন বেনারকে বলেন, “পঞ্চগড়ের মুখ্য বিচারিক হাকিমের তত্ত্বাবধানে একটি ‘ম্যাজিস্ট্রেট টিম’ এই ঘটনার বিচারিক তদন্ত করবে। সহায়তা করবেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও কারা কর্তৃপক্ষ।”

“এই আদেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে,” বলেন তিনি।

কারা হেফাজতে মৃত্যুর এই ঘটনায় ‘কারা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন অবৈধ নয়’ তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছে আদালত। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব, কারা মহাপরিদর্শকসহ মোট চারজনকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সুমন নিজেই তাঁর রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেছুর রহমান।

সরকারি এই আইন কর্মকর্তা আদালতকে জানান, পলাশ দগ্ধ হওয়ার দিন পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক একটি এবং তাঁর মৃত্যুর দিন রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কারা উপ মহাপরিদর্শক আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

এ ছাড়া প্রশাসন বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

“জেল-কারাগারকে মনে করা হয় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। এমন একটি নিরাপদ জায়গায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে এটা পুরোপুরি বের হয়ে আসবে,” মন্তব্য করে আদালত।

আগামী ২৩ জুন এ মামলা পরবর্তী আদেশের জন্য আবার আদালতে উঠবে বলে বেনারকে জানিয়েছেন ব্যারিস্টার সুমন।

মৃত্যুর আগে জবানবন্দি রেকর্ড

“পলাশ মৃত্যুর আগে ওর কথাগুলো খুব সুন্দর করে বলে গেছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত দল তাঁর কথাগুলো আমলে নিলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে,” বেনারকে বলেন পলাশের মা মীরা রানী রায়।

গত ২৬ এপ্রিল সকালে অগ্নিদগ্ধ হওয়া পলাশ ৩০ এপ্রিল দুপরে মারা যাওয়ার মাত্র আধা ঘণ্টা আগে ভাই অমিয় কুমার রায় ও ভাগ্নে প্রসিনজিৎ সরকার রায়কে তাঁর জবানবন্দি মুঠোফোনে ‘রেকর্ড’ করার অনুরোধ করেন।

আদালতে রিট আবেদনের সাথে এই রেকর্ডটিও জমা দিয়েছিলেন সুমন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) বসে দেওয়া পাঁচ মিনিট সাত সেকেন্ডের ওই জবানবন্দিতে পলাশ দাবি করেন, জেলখানার ভেতরে দুই ব্যক্তি তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “২৬ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে দুজন লোক টাইগার (শক্তিবর্ধক পানীয়) বোতল থেকে কী যেন ছুঁড়ে আমার শরীরে আগুন লাগিয়ে আমার জীবনকে মৃত্যুর মুখোমুখি ঠেলে দেয়। এই অপরাধীদের বিচার চাই।”

প্রশ্নবিদ্ধ কারা কর্তৃপক্ষ

“আমাকে পঞ্চগড় জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি আমাকে হয়রানি করে, হুমকি দেয়, ছবি তোলে। আমি জেলার সাহেবকে বলি। কিন্তু পঞ্চগড়ের জেলার সেটি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো ক্ষমতাশালীদের পক্ষ নেয়,” জবানবন্দিতে এভাবেই বলেছেন পলাশ।

তাঁর মা বেনারকে জানান, অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ১০/১২ দিন আগে কারাগারে দেখা করতে গেলে পলাশ জানান, তিনজন লোক এসে তাঁর সাথে কথা বলেছে, তাঁর ছবিও তুলেছে তারা।

“এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলার সাহেব নিজে আমাকে বলেন, তিনজন লোককে আমি ঢোকার ও পলাশের সাথে দেখা করার অনুমতি দিয়েছিলাম; কিন্তু তাদের ছবি তোলার অনুমতি দিইনি,” যোগ করেন মীরা রানী রায়।

তবে শুরু থেকেই এ ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা’ দাবি করা পঞ্চগড়ের জেল সুপার মুশফিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কেউ তাঁর (পলাশের) সাথে দেখা করেনি, ছবি তোলেনি।”

ব্যারিস্টার সুমন বলেন, “আদালত শুনানিতে বলেছেন, ছেলেটাকে যদি হত্যা করা নাও হয়ে থাকে, সে যদি আত্মহত্যাও করে থাকে, তাহলেও এটা বের হয়ে আসা দরকার- কারা অভ্যন্তরে সে কেরোসিন অথবা দাহ্য পদার্থ কোথায় পেল, কীভাবে আগুন দিলো?”

পলাশের ভাই অমিয় কুমার রায় বেনারকে বলেন, “পলাশের শেষ কথাগুলো শুনলে স্পস্ট বোঝা যায় এখানে জেলারও জড়িত। তাঁর গায়ে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে।”

এদিকে পলাশের জবানবন্দিটি ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ দাবি করে জেলার বেনারকে বলেন, “অপরিচ্ছন্নতা এড়াতে আমরা ‘ম্যাচ’ (দিয়াশলাই) ঢুকতে দেই না। কিন্তু বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার জন্য কয়েদীদের কাছে ‘গ্যাস লাইটার’ থাকে। ওটাই পলাশ আগুন জ্বালাতে ব্যবহার করেছে।”

“কেরোসিন বা পেট্রল ব্যবহারের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি,” দাবি তাঁর।

গত ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত আটোয়ারী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন পলাশ। তিনি সরাসরি রাজনীতি না করলেও সব সময় সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত এই আইনজীবী ছিলেন হিন্দু ছাত্র মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে ১০ এপ্রিল সারা দেশে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় হিন্দু মহাজোট। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শুক্রবার এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংগঠনটির নেতারা বলেন, “বাংলাদেশ হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে।”

অভিযোগ কোহিনূরের বিরুদ্ধে

জবানবন্দিতে পলাশ কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।

তিনি বলেন, “আমি ২০১৩ সালে কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানিতে আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেই। এরপরে ২০১৬ সালে কোহিনুর কোম্পানির মালিক আমাকে দিয়ে ভুয়া দলিল, অন্যায় এবং অবৈধ কাজ করার জন্য নির্দেশনা দিলে আমি সেটা করিনি বলে আমি চাকরি থেকে ইস্তফা দেই।”

“এরপর আমার নামে ৩১ লাখ টাকা আত্মসাতের মিথ্যা মামলা করে,” যোগ করেন তিনি।

পলাশ আরো বলেন, “এ ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ২৫ মার্চ পঞ্চগড়ে মানববন্ধন করি। উল্টো আমার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অপরাধে মানহানির মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।”

তাঁর ভাই অমিয় বলেন, “আমাদের ধারণা কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানির যোগসাজশেই পলাশের গায়ে আগুন দেওয়া হয়েছে।”

কোহিনূর কেমিক্যালের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার বেনারকে বলেন, “এটা নিয়ে আমাদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই আসলে। কারণ বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা ঠিক না। তবে তিনি (পলাশ) কিছু টাকা পয়সা তছরূপ করেছিলেন।”

জেলার মুশফিকুর বলেন, “২৮ তারিখ ঢাকার আদালতে হাজির করার নির্দেশ শোনার পর থেকেই পলাশ মুষড়ে পড়েছিলেন, তাঁর মন খারাপ ছিল। তিনি হয়তো গায়ে আগুন লাগিয়ে নিজেকে আহত করে যেকোনোভাবে ঢাকা যাওয়া এড়াতে চাইছিলেন।”

উল্লেখ্য, কোহিনূরের মামলায় ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন