Follow us

গুজব, গণপিটুনি ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও অস্থিরতা

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-07-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাজধানীতে গণপিটুনিতে এক নারীকে হত্যার মামলায় আটক আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। ২২ জুলাই ২০১৯।
রাজধানীতে গণপিটুনিতে এক নারীকে হত্যার মামলায় আটক আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। ২২ জুলাই ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

হঠাৎ করে গুজবের ভিত্তিতে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সারা দেশের পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সোমবার সকল জেলার পুলিশ সুপারসহ প্রতিটি ইউনিটকে এই নির্দেশনা পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের এআইজি (অপারেশনস) সাঈদ তারিকুল হাসান।

পাশাপাশি সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে আইন হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশকে জানাতে এক তথ্য বিবরণীতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার। গুজব ছড়ানো এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে দণ্ডনীয় অপরাধ, সে বিষয়েও নাগরিকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে গণপিটুনিতে ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত চার দিনে এমন নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৭ জন। সব মিলিয়ে এ বছরে এখন পর্যন্ত ৪৩ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সুশিক্ষার অভাব, মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা- এসব কারণেই মূলতঃ এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বেনারকে বলেন, “মানুষের মধ্যে চরম মূল্যবোধ এবং সামাজিক অবক্ষয় হয়েছে। মানুষ প্রচণ্ডভাবে অধৈর্য হয়ে উঠছে। বিচার-বিবেচনা না করেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এসব তারই ফল।”

“তা ছাড়া বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে যখন অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়। তখন আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হতে থাকে। যা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে উসকানি দেয়,” বলেন তিনি।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বেনারকে বলেন, “বিচার ব্যবস্থার উপরে মানুষের এক ধরনের আস্থা উঠে গেছে। তা ছাড়া বিচার যে সব মানুষের অধিকার এই শিক্ষাটা আমাদের সেভাবে নেই। এটা নিয়ে সচেতনতা কম।”

তিনি বলেন, “কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই উচিত নয়, সেটি গণপিটুনি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ক্রস ফায়ার। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে এসবই ঘটছে। যার কোনো বিচার হচ্ছে না।”

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণকাজে ‘শিশুদের মাথা লাগবে’ বলে ফেইসবুকে গুজব ছড়ানো হয়, যাতে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল সরকার। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

গত শনিবার রাজধানীর বাড্ডায় এক স্কুলের সামনে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে তাসলিমা বেগম রেনু (৪১) নামে এক নারী গণপিটুনিতে নিহত হন।

পরে জানা যায়, ওই নারী তার চার বছরের মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য ওই স্কুলে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনেকে।

ওই দিন রাতেই রাজধানীর অদূরে সাভারের আরেক নারী বাড়িভাড়া খুঁজতে গিয়ে গণপিটুনিতে মারা যান।

এছাড়া রোববার নওগাঁ জেলায় ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে ছয়জনকে মেরে ফেলা হয়।

নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান

সোমবার সারা দেশের পুলিশের ইউনিটকে পাঠানো চিঠিতে ছেলেধরা গুজব বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং ব্লগগুলো নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিলে বা শেয়ার করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দিয়েছে পুলিশ।

চিঠিতে বলা হয়, গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা ফৌজদারি অপরাধ। এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তিন দিনের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরকে জানাতে বলাও হয়েছে।

চিঠিতে ছেলেধরার গুজব ও গণপিটুনি রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নজরদারি বাড়ানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনিটরিং এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য বলেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ব্লগ এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছেলেধরা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিমূলক পোস্টে মন্তব্য বা গুজব ছড়ানোর পোস্টে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

এর আগে শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ এমন গুজবকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে।

গুজব ছড়িয়ে ও গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ উল্লেখ করে গণপিটুনি না দিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

একদিনে গণপিটুনির শিকার ১৯

রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে ১৯ জনকে গণপিটুনি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের পাঁচজন নারী, চারজন মানসিক ভারসাম্যহীন ও একজন প্রতিবন্ধী।

পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে স্থানীয়রা ছেলেধরা বলে মারধরের চেষ্টা করলে কয়েকজন তরুণ তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশে খবর দেন।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তিনটি পৃথক ঘটনায় গণপিটুনির শিকার দুজন নারীসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে পুলিশ।

মাদারীপুরে প্রায় ৬০ বছর বয়সী এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ‘গলাকাটা’ সন্দেহে স্থানীয়রা মারধর করে বলে খবর পাওয়া যায়।

রোববার সন্ধ্যায় নাটোরের সিংড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে আলী আহমদ নামের এক মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে পাঠায় স্থানীয়রা।

কুষ্টিয়ার জেলার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত সাংবাদিকদের জানান, সারাদিনে এই জেলায় গণপিটুনির শিকার ছয়জনকে উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের জেলা রাজশাহীর চারঘাটে সোমবার দুপুরে ছেলেধরা সন্দেহে এনজিওকর্মী পরিচয় দেওয়া পাঁচজনকে মারধর করে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে।

রেনু হত্যায় চারজন আটক

এদিকে রাজধানীতে গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনুকে হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলেন- মো. শাহীন (৩১), বাচ্চু মিয়া (২৮), শহিদুল ইসলাম (২১) ও জাফর হোসেন (১৮)।

বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক বেনারকে বলেন, বিভিন্ন মানুষের মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে রোববার রাতে তাঁদের আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা তাসিলমা বেগম রেনু হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

সোমবার আদালতে হাজির করলে এদের মধ্যে জাফর হোসেন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তিনি বলেন, ছেলেধরার শোনার পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে রেনুকে তিনি লাথি মারেন এবং লাঠি দিয়েও কয়েকবার আঘাত করেন।

শুনানি শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বাকি তিনজনকে চার দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন