Follow us

পাহাড়ে রক্ত ঝরছেই, এবার রাঙ্গামাটিতে জোড়া খুন

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-09-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকায় ঝুড়িতে করে সামগ্রী বহন করে নিয়ে যাচ্ছে দুই আদিবাসী কিশোরী। ০৫ মার্চ ২০০১।
রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকায় ঝুড়িতে করে সামগ্রী বহন করে নিয়ে যাচ্ছে দুই আদিবাসী কিশোরী। ০৫ মার্চ ২০০১।
AFP

পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুই কর্মী নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তাঁদের হত্যা করা হয়।

স্থানীয় পুলিশের হিসাব ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে শুধু রাঙ্গামাটিতেই ৩৮জন খুন হয়েছেন। গত ২২ আগস্ট জেলার বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতির কর্মী মিশন চাকমা নিহত হন। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে সেখানে আবারও জোড়া খুনের ঘটনায় পাহাড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

নিহতরা হলেন আকর্ষণ চাকমা ওরফে যুদ্ধ মোহন চাকমা (৪২) ও শ্যামল কান্তি চাকমা ওরফে সুমন্ত চাকমা (৩০)। ইউপিডিএফ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রতিপক্ষ জনসংহতি সমিতিকে (এমএন লার্মা) অভিযুক্ত করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটি।

“আমরা বিশ্বাস করি এই হত্যার সঙ্গে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) জড়িত,” ইউপিডিএফ এর মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বেনারনিউজকে বলেন।

তাঁর মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার চক্রান্ত চলছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাহাড়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু কোনো বিচার হচ্ছে না।

জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত ত্রিপুরা হত্যাকাণ্ডে তাঁর দলের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, জোড়া খুনের কারণ ইউপিডিএফের আভ্যন্তরীণ কোন্দল।

“জোড়া খুনের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। ওদেরকেই (ইউপিডিএফ) বরং জিজ্ঞাসা করুন হত্যাকাণ্ডের কারণ কী?” প্রশান্ত ত্রিপুরা বেনারনিউজকে বলেন। তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না তার জবাব প্রশাসন দিতে পারবে। জনসংহতি সমিতি (এমএন লার্মাও) সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আকর্ষণ চাকমা ও শ্যামল কান্তি চাকমা বৃহস্পতিবার রাতে সাংগঠনিক কাজে রামসুপারিছড়ায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে সুমতি চাকমার বাড়িতে তাঁরা রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ১০–১২ জনের একটি দল সুমতি চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে। এরপর অতর্কিত গুলি ছুড়তে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই আকর্ষণ ও শ্যামল নিহত হন।

এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। ময়নাতদন্তের পর আইনগত প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে বলে জানান নানিয়ার চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল লতিফ।

“পুলিশ প্রশাসন আইন অনুযায়ী যা করার তাই করছে। তাঁদের দিক থেকে গাফিলতি নেই। অন্তর্দ্বন্দ্বই এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ,” বেনারকে জানান আবদুল লতিফ।

“আঞ্চলিক এই দ্বন্দ্ব যদি বিবদমান পক্ষগুলো বন্ধ করতে না পারে তাহলে পাহাড়ে শান্তি আসবে না,” মনে করেন আবদুল লতিফ বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান কারণ আধিপত্য বিস্তার। বিবদমান সব কটি দলই চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ের মানুষকে সবকটি দলেরই মন যুগিয়ে চলতে হয়। এমনও দেখা গেছে, কোনো একটি পক্ষ থেকে বাঁচতে পাহাড়ের মানুষ অপর একটি পক্ষের আশ্রয় নিয়েছেন। তখনই দু পক্ষের মধ্যে মারামারি-খুনোখুনির ঘটনা ঘটে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সক্রিয় চারটি সংগঠন হলো; পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), জনসংহতি সমিতি (এমএন লার্মা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)।

পাহাড়ে কাঠের ব্যবসা, কাঁচা বাজার, পশুর হাট ও পরিবহন থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ আছে বিবদমান পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবন, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে দীর্ঘদিন স্বাধীনতার দাবিতে সহিংসতা চলেছে। ‘শান্তি বাহিনী’ নাম দিয়ে তারা যুদ্ধ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর অস্ত্র সমর্পণের মধ্য দিয়ে বিরোধের অবসান হয়।

পার্বত্য জেলা জনসংহতি সমিতির প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) নেতৃত্বে চলা যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। তবে শান্তিচুক্তি গত ২১ বছরেও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার অ​ভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন সন্তু লারমা।

বাংলাদেশ ইনডিজিনাস পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং মনে করেন, শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই পাহাড় অশান্ত থাকছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ও সরকার সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না।

“২১ বছরে চুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি, বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনাও আর দেখা যাচ্ছে না। যে আশা নিয়ে পাহাড়ের মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছিল, সেটা পূরণ হয়নি। ফলে তারা বহু দল উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে,” সঞ্জীব দ্রং বেনারনিউজকে বলেন।

পাহা​ড়ি ওই নেতা আরও বলেন, যারা খুন হচ্ছেন তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, সেটা খতিয়ে দেখলেই মূল সমস্যাটা বোঝা যাবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন