Follow us

ভারতে মুসলিম নির্যাতন: সরকারের শক্ত ভূমিকা চায় ইসলামী দলগুলো

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-03-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
দিল্লিতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকায় ইসলামী দলগুলোর বিক্ষোভ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
দিল্লিতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকায় ইসলামী দলগুলোর বিক্ষোভ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[এএফপি]

ইসলামী দলগুলোর মতে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারতে মুসলমানদের ওপর আক্রমণের নিন্দা করা। এসব দল চায়, বাংলাদেশ যেন ভারতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী দলগুলোর কথা অনুযায়ী ভারতকে চাপ দেওয়া বা কড়া ভাষায় নিন্দা করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। আর সেকারণে বাংলাদেশের ভূমিকা ততটা প্রকাশ্য নয়।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “আমরা চুপ করে আছি কথাটা ঠিক নয়। আমরা নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব সংশোধন বিল নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে ভারতের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে যাচ্ছি।

মন্ত্রী বলেন, “সর্বশেষ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আমার সাথে দেখা করতে এলে আমি দিল্লির ঘটনাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি তাঁকে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধন আইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এগুলোর প্রয়োজন ছিল কি না।”

“ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, ভারতের ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই,” জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ফোরামে বাংলাদেশ তার উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে বলে জানান একে আব্দুল মোমেন।

সর্বশেষ দিল্লিতে মুসলিমদের ওপর আক্রমণের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে তাঁর ১৭ মার্চ বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ বাতিলের দাবি করে আসছিল ইসলামী দলগুলো।

এরই মধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস আক্রান্ত তিন রোগী শনাক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেনারকে এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়রে মুখপাত্র রবিশ কুমার দিল্লীতে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।

বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকিীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুই দিনের সফরে ১৭ মার্চ ঢাকা আসার কথা ছিল নরেন্দ্র মোদির।

মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারাদেশে ইসলামী দলগুলো যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, তা বাতিল করার কথা বেনারকে জানান খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের।

এ প্রসঙ্গে আহমেদ আব্দুল কাদের বেনারকে বলেন, “আমাদের সরকার ভারতের মুসলিম বিরোধী পদক্ষেপ যেমন, এনআরসি, নাগরিকত্ব সংশোধন এবং সর্বশেষ দিল্লিতে মুসলমানদের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ নিয়ে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করার মধ্যেই আছে। সরকার এর কড়া নিন্দা পর্যন্ত করছে না।”

“মুসলামানদের ওপর যে আক্রমণ চলছে সেব্যাপারে ভদ্রভাবেও শক্ত কথা বলা যায়,” বলেন তিনি।

“এ কারণে জনগণ চায় না নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসুন,” জানান আব্দুল কাদের।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বেনারকে বলেন, “প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশকে বিশ্বের সকল মুসলমানের দায়িত্ব নিতে হবে কেন? বাংলাদেশ তো ইসলামী রাষ্ট্রের নেতা নয়।”

তিনি বলেন, “ভারতে মুসলমানদের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ হলো, সেখানে যদি বাংলাভাষী মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন করা হয় তাহলে তারা বাংলাদেশে চলে আসতে পারে। সে কারণে বাংলাদেশের উচিত ভারতের কাছে এই নিশ্চয়তা আদায় করা যে, তাদের দেশ থেকে কোনও মানুষ যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ না করে।”

তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, “ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরেছে এবং ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এনআরসি, নাগরিকত্ব আইনে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।”

তিনি বলেন, “ভারতের আশ্বাস আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কোনো দিক থেকেই বাংলাদেশ ভারতের ধারে কাছে নেই। এটা বাস্তবতা। এটি মেনে কাজ করতে হবে।”

তৌহিদ হোসেন বলেন, “ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাঁচামাল ও ভোগ্য পণ্যের সরবরাহের জন্য আমরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এসব মিলিয়ে ভারতকে নিন্দা করার মতো শক্ত অবস্থান বাংলাদেশের নেই।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রদূত মুনশি ফয়েজ আহমদ বেনারকে বলেন, “দেখুন, যারা বলছেন ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে সে ব্যাপারে সরকার কিছু বলছে না—আসলে কিন্তু বিষয়টি তা নয়। প্রথম কথা হলো, সবকিছু সব সময় সরাসরি বলা যায় না। সরকারের বাইরে থেকে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু সরকারে গেলে অনেক বিষয় মাথায় রেখে কথা বলতে হয়।”

তিনি বলেন, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন অফিসিয়াল ফোরামে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা ভারতকে জানাচ্ছে সরকার। যেমন কয়েকদিন আগে একটি আলোচনা সভায় ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা বলেছেন, ভারতের এমন কিছু করা উচিত হবে না যাতে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ক্ষতির মুখে পড়ে। এ রকম কথার মাধ্যমে ভারতকে একটি বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ।”

মুন্সী ফয়েজ বলেন, “বাংলাদেশের স্বার্থের কারণে ভারতকে প্রয়োজন। তাদের সাথে ঝগড়া করার প্রয়োজন নেই। আবার ভারতের সব বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা থাকা উচিত নয়। কারণ আমরা চাইলেও অনেককিছু করতে পারব না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন