Follow us

গুমের ঘটনা তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবি

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2017-08-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে ভুক্তভোগী ১৯ টি পরিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা আয়োজন করে। আগস্ট ২৯, ২০১৭।
আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে ভুক্তভোগী ১৯ টি পরিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা আয়োজন করে। আগস্ট ২৯, ২০১৭।
বেনারনিউজ

আপডেট: ২৯ জুন, ইস্টার্ন টাইম জোন  দুপুর ০১:৩০

গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে সরকারকে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তাঁদের স্বজনেরা। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত কমিশন গঠিত না হলে তাঁরা রাস্তায় নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবসের একদিন আগে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ভুক্তভোগী ১৯ টি পরিবার একটি আলোচনা সভা থেকে এই দাবি জানান। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সম্প্রতি ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি মোর্চা গঠন করেছেন।

‘মায়ের ডাক’ এর দাবি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এই গুম, খুন, অপহরণের জন্য দায়ী। সে কারণে রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রকেই তার নাগরিকদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিতে হবে।

তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারের কাছে সুবিচার আদৌ পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

“কেউ কেউ বলেছেন বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্তের কথা। আমি বলি যে সরকার গুম করেছে তারা কি তদন্ত করবে? বরং আসুন আমরা যারা আছি সবাই মিলে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করি। ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের তালিকা তৈরি করি এবং তাদের কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিই,” মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসেবে জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত ৩৮৮ জন গুমের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ৫১ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে, ১৯৩ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়, কাউকে কাউকে গুম করে রেখে আদালতে হাজির করা হয়। ১৪৪ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যায়নি।

গতকাল এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ও অধিকার এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, গুমের পেছনে যদি সরকারের হাত না থেকে থাকে তাহলে তাদের তদন্ত করে দেখতে ভয় পাওয়ার কথা নয়।

বিবৃতিতে তারা বলছে, সাতক্ষীরার মোখলেছুর রহমান জনি গুমের ঘটনায়, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি কমপক্ষে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে। সংগঠনগুলো বলছে, গুমের শিকার বেশির ভাগ ব্যক্তিই বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী। তারা মনে করে না সরকারের উচ্চ পর্যায়কে অবহিত না করেই এই ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে।

তবে গত জুলাইতে গুম-খুনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিরা অপরাধ করে বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে আছে বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

“আসলে তথাকথিত গুম হওয়া ব্যক্তিরা ক্রাইম করে বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে আছে; আর সরকারকে বিব্রত করতে তারা গুম হয়েছে বলে অভিযোগ করছে,” ১২ জুলাই বেনারকে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যা বলছে

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর র‌্যাব-১ সদস্য পরিচয় দিয়ে নাখালপাড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সাজেদুল ইসলাম সুমনকে। সাজেদুল ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডেও সাধারণ সম্পাদক। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সাজেদুল ইসলামের সত্তোরোর্ধ্ব মা হাজেরা খাতুন। তিনি বলেন, তিনি শুধু তাঁর ছেলেকে নয়, যাঁরা গুম হয়েছেন তাঁদের সবাইকে ফেরত চান।

“আমি সব সন্তানকেই তাদের মায়ের কোলে দেখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিজেও তো একজন মা এবং আপনি নিজেই আপনার বাবা মাসহ পরিবারকে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনার মধ্যে হারিয়েছেন। আপনি তো বোঝেন পরিবারের প্রিয়জন হারিয়ে গেলে কী কষ্ট। আপনাকে অনুরোধ করব আপনি উদ্যোগ গ্রহণ করে আমাদের এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান,” হাজেরা খাতুন বলেন।

সাজেদুল যেদিন গুম হন, সেদিন তাঁর সঙ্গে থাকা তাঁর খালাতো ভাই জাহিদুল করিম তানভীরকে নাখালপাড়া থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একই দিনে তাঁদের ঘনিষ্ঠ চারজন মাসুম, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, আসাদুজ্জামান রানা ও আল আমিনকে এবং পরদিন এম এ আদনান ও কাউসার নামে দুজনকে তেজগাঁও থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় একদল অস্ত্রধারী।

বংশাল থেকে একদিনে গুম হন সোহেল ওরফে চঞ্চলসহ ছাত্রদলের চার যুবক। সোহেলের মা বিবি হাজেরা বলেন, “আমার ছেলে কি বেঁচে আছে? আমি কি এখনও আশা করতে পারি যে ছেলে আসবে? না কি সে বেঁচে নেই?”

২৯ মার্চ, ২০১৪ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের যুবলীগ নেতা কাজী রকিবুল ইসলাম শাওনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। তাঁর মা আনোয়ারা বেগম সন্তানের শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন বলে জানান রকিবুলের বাবা কাজী আবদুল মতিন। মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেহরক্ষী এই কাজী আবদুল মতিন। তিনি কথা বলছিলেন বেনার নিউজের সঙ্গে।

“ওই রাতে ছেলে ঘরেই ছিল। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। মধ্যরাতে দরজায় ধাক্কা দিতে শুনি। সারা বাড়ি তখন ঘিরে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যেই র‌্যাব পরিচয়ে দুজন অস্ত্রধারী লোক রকিবুলকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা তাকে কেন তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে, তারা প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করে,” কাজী আবদুল মতিন বলেন।

পরদিন সকাল ১০টায় তিনি র‌্যাব অফিসে গেলে তাঁর ছেলের নামে কেউ গ্রেপ্তার নেই বলে জানানো হয়। ঘটনার পর ৩১ মার্চ কোতোয়ালি মডেল থানায় রকিবুলের স্ত্রী ফারজানা আক্তার একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। কাজী আবদুল মতিন নিজেও মামলা করেছেন। এখনো সেই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি।

সরকারের কর্মসূচি নেই

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে সরকারের কোনো কর্মসূচি নেই। সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি সরকারের সমালোচনা করেন।

“এই দিবসকে সামনে রেখে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্নভাবে কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করতে আমরা দেখছি না। কারণ রাষ্ট্রই যখন একটি মানুষকে গুম করে তখন সে বিষয়ে তারা কেনই বা কথা বলবে?” আফরোজা ইসলাম আঁখি বলেন।

মানবাধিকার কর্মী ও নারী পক্ষের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শিরীন হক বলেন, "সরকারকে অবশ্যই দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।"

গুম নিয়ে আন্তর্জাতিক যে কনভেনশন সেখানেও বাংলাদেশ যেন অনুস্বাক্ষর করে সেই দাবি করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন