Follow us

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষতি কাটাতে পশ্চিমবঙ্গে মোদি দেবেন হাজার কোটি রুপি

পরিতোষ পাল ও কামরান রেজা চৌধুরী
কলকাতা ও ঢাকা
2020-05-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে জলোচ্ছাসে সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাওয়া একটি চিংড়িঘেরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন গ্রামবাসী। ২২ মে ২০২০।
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে জলোচ্ছাসে সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাওয়া একটি চিংড়িঘেরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন গ্রামবাসী। ২২ মে ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

ক্ষয়ক্ষতি দেখতে মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য এক হাজার কোটি রুপি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে ত্রাণ ও পূনর্বাসণ কার্যক্রম শুরু করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসাথে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে শুক্রবার ফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ জনে। মৃতদের ১৯ জন কলকাতার। বাকিদের মৃত্যু হয়েছে সাত জেলায়।

আর বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৩ জন, এই তথ্য নিশ্চিত করেছে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুর রহমান বেনারকে বলেন, “দেশের যে ১৯ জেলা আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে ত্রাণ ‍ও পূনর্বাসন কার্যক্রম চলছে। তবে সেগুলোকে আরও জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁদের বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করতে সহায়তা করছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাবার, খাবার পানিসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। যেসকল রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবাহ স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেকল বাঁধ ভেঙ্গে গেছে সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে।”

বৃহস্পতিবারের ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩। সবচেয়ে বেশি ১৩ জন মানুষ মারা গেছেন যশোরে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বেনারকে জানান, মনিরামপুরে পাঁচজন, শার্শায় চারজন, চৌগাছায় দুজন, এবং সদর উপজেলা ও বাঘারপাড়া উপজেলায় একজন করে মারা গেছেন।

এছাড়া পিরোজপুরে তিনজন, পটুয়াখালী ও ভোলায় দুজন করে এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামে একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

পশ্চিমবঙ্গে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর বসিরহাটে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে অন্যদের সাথে হেলিকপ্টারে উঠছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২২ মে ২০২০। [বেনারনিউজ]

পশ্চিমবঙ্গকে হাজার কোটি রুপি সহায়তা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে করে হেলিকপ্টারে শুক্রবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের রাজ্যপাল ও চার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

প্রায় এক ঘন্টা ধরে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গোসাবা, কুলতলি, ডায়মন্ড হারবার-সহ বিভিন্ন এলাকা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার রাজারহাট, মিনাখাঁ, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি, হাসনাবাদ, বসিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেন বলে সাংবাদিকদের জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আকাশ পথে পরিদর্শন শেষে উত্তর চব্বিশ পরগণার বসিরহাটে প্রশাসনিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক রিপোর্ট তুলে দেওয়া হয়। বৈঠকে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি রাজ্য সরকারকে পুনর্গঠন কাজের জন্য এই মুহূর্তে এক হাজার কোটি রুপি অগ্রিম সহায়তা দেবার কথা ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা রাজ্যের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুনর্বাসন, পুনর্গঠনের ব্যাপক পরিকল্পনা তৈরি করে বাংলার এই দুঃখের সময়ে পূর্ণ সহযোগিতা করব।’’

প্রধানমন্ত্রী এদিন ঘোষণা করেন, মৃতদের পরিবারকে দুই লক্ষ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। রাজ্য সরকার অবশ্য আগেই মৃতদের আড়াই লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ দেবার কথা জানান।

প্রশাসনের প্রাথমিক হিসেবে, আম্পান ৪০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সাত-আটটি জেলা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত, আরও চার-পাঁচটি জেলা বিপর্যস্ত। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার পুনর্ঘঠন কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে এক হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে।

আকাশ পথে পরিদর্শনের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, “চারিদিকে শুধু জল আর জল। বহু এলাকা এখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। বহু গাছ উপড়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ফসলের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। নদীর বাঁধগুলো ভেঙ্গে গিয়েছে।”

তিনি বলেন, এখন আমাদের নবনির্মাণে হাত লাগাতে হবে। সকলে মিলে এটা করতে হবে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ফোন করে আম্পানে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার সকালে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে টেলিফোন করে সাইক্লোনে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতিতে সমবেদনা জানান এবং অচিরেই রাজ্য সরকার এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আম্পান গত বুধবার বিকেলে পশ্চিমবঙ্গে এবং সন্ধ্যায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মৃতের সংখ্যা ৮৮ উল্লেখ করা হয়েছে।

অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান সুন্দরবন অঞ্চলে আছড়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধ্বংসলীলা চালায় আম্পান।

কলকাতাকে সচল করতে সাত দিন লাগবে

বিধ্বস্ত কলকাতাকে পুরোপুরি সচল করতে সাতদিন সময় লাগবে বলে জানান কলকাতার বিদায়ী মেয়র ফিরহাদ হাকিম। শুক্রবার কলকাতা পুরসভার সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের ছোবলে কলকাতায় সাড়ে ৫ হাজার গাছ উপড়ে গেছে। আড়াই হাজার ল্যাম্পপোস্ট ভেঙ্গে গিয়েছে। অনেক এলাকা এখনো জলমগ্ন। বিদ্যুৎ না থাকায় নাগরিকদের দুঃসহ সময় কাটাতে হচ্ছে। টিভি বন্ধ। পুরসভার জল সরবরাহ চালু হলেও বিদ্যুতের অভাবে অধিকাংশ বাড়ি ও বহুতলে পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে।”

“বিদ্যুৎ সংস্থাকে বলা হয়েছে দ্রুত সংযোগ চালু করার জন্য,” জানিয়ে তিনি বলেন, “রাস্তা থেকে গাছ সরানোর কাজও চলছে পুরোদমে। তবে কর্মী ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।”

শহরবাসীর কাছে তাঁর আবেদন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য কিছুটা ধৈর্য্য ধরতে হবে।”

এদিকে জল, বিদ্যুতের দাবিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় চলছে অবরোধ ও বিক্ষোভ। ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার ৪৮ ঘন্টা পরেও বিদ্যুৎ ও জল না থাকায় ক্ষুব্ধ মানুষ।

বেহালায় একটি অবরোধে দাঁড়িয়ে স্থানীয় যুবক মানস হালদার বেনারকে বলেন, “দুঃসহ অবস্থায় রয়েছি। আলো নেই, জল নেই। বাড়ির অসুস্থ ও প্রবীণদের অবস্থা খুবই খারাপ।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন