Follow us

ইউপি সদস্যসহ চার ইয়াবা কারবারি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
কক্সবাজার ও ঢাকা
2020-07-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের জাদিমুরা-শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ে র‌্যাবের অভিযানে সাত রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন টেকনাফ থানার পুলিশ সদস্যরা। ২ মার্চ ২০২০।
কক্সবাজারের জাদিমুরা-শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ে র‌্যাবের অভিযানে সাত রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন টেকনাফ থানার পুলিশ সদস্যরা। ২ মার্চ ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত পৃথক দুই বন্দুকযুদ্ধে এক রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ মোট চার ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। শুক্রবার মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কক্সবাজার এবং ঢাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট ৫১ রোহিঙ্গা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে আটজন মারা গেছেন গত দুই সপ্তাহে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে সারা দেশে ক্রসফায়ারে ৩৬১ জন নিহত হন, এদের মধ্যে ৪০ জন রোহিঙ্গা।

এই হিসাবে চলতি বছরের সাত মাসের কম সময়ে রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেশি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “মনে করা হচ্ছিল, এই সময়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, এই দুর্যোগের মধ্যেও প্রায় প্রতিনিয়ত মাদক বা অস্ত্র উদ্ধারের নামে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে।”

“শুধু কক্সবাজার জেলার দিকে তাকালেই এর তীব্রতাটা সহজে বোঝা যায়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহতদের বেশিরভাগই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী,” বলেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি-প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বেনারকে বলেন, “চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে জেলায় মোট ৬৭ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৫১ জন রোহিঙ্গা।”

চলতি মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৪৩ ছিল বলে এর আগে বেনারকে জানিয়েছিলেন ইকবাল হোসাইন। এই হিসেবে মাত্র গত দুই সপ্তাহে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন আটজন রোহিঙ্গা।

“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে, অপরাধীকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করা,” মন্তব্য করে নূর খান লিটন বলেন, “বিশেষ করে অন্যদেশের কেউ যদি আশ্রিত থাকা অবস্থায় অপরাধ করে, তবে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা দরকার।”

তবে বর্তমানে শরণার্থী শিবিরে অস্ত্রধারী রোহিঙ্গারা ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছে বলে জানান এএসপি ইকবাল।

তিনি বলেন, “অভিযান চালানোর সময় তারা যদি গুলি ছোঁড়ে, তখনই শুধু আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। এতে অনেক সময় অপরাধীরা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে।”

“আমরা কাউকে ইচ্ছে করে গুলি করে মারছি না,” দাবি করেন তিনি।

“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকের মধ্যে এমন একটি ধারণা আছে যে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা করে অপরাধীদের ভীত করে অপরাধ কমানো যাবে। কিন্তু গত দশ বছরের চিত্রই খেয়াল করে দেখুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অপরাধের মাত্রা,” বলেন লিটন।

তাঁর দাবি, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে প্রবেশ সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক হয় না।

বিগত ৩০ বছর ধরে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) সভাপতি ড. অরূপ রতন চৌধুরী বেনারকে বলেন, মহামারির সুযোগ নিয়েই অনেক মাদক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসার পসার বাড়াতে চাইছে।

“এক্ষেত্রে মিয়ানমার থেকে আনা মাদক ইয়াবা কারবারিরা রোহিঙ্গাদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাঁরাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য বহনকারী। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ইয়াবা মজুদ এবং লেনদেনের নিরাপদ স্থান,” যোগে করেন তিনি।

যদিও কক্সবাজারের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা শিবিরের মাদক মজুদ বা বেচাকেনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

বন্দুকযুদ্ধে নিহত চার

শুক্রবার ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা হলেন কুতুপালং শিবিরে ইউছুফ আলীর ছেলে মো. তাহের (২৭) এবং তাঁর বাংলাদেশি গডফাদার, শরণার্থী অধ্যুষিত রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মৌলভী বখতিয়ার ওরফে বখতিয়ার উদ্দিন মেম্বার (৫৫)।

পুলিশ বলছে, তাঁরা দুজনই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মাদক মামলা রয়েছে।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ সাংবাদিকদের বলেন, “মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারে গেলে নিহতদের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এ ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।”

ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭ রাউন্ড কার্তুজ, ১৩ রাউন্ড কার্তুজের খোসা, ৪০ হাজার পিস ইয়াবা এবং ইয়াবা বিক্রির ১০ লাখ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে রাত আড়াইটার দিকে ইয়াবার চালান নিয়ে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশকালে দিয়াবাড়ি এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

নিহতরা হলেন নরসিংদীর রায়পুরার ইব্রাহিম খলিল (৪৫) ও ভোলার চরফ্যাশনের ওমর ফারুক (৩৫)।

র‌্যাব জানিয়েছে, ঢাকায় যে কয়জন মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের মধ্যে ইব্রাহিম খলিল একজন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ২০১০ সাল থেকে ১৫টি মাদক মামলা রয়েছে। ওমর ফারুক তাঁর সহযোগী। তাঁর বিরুদ্ধেও ১৪টি মাদক মামলা রয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবিরের করোনা পরিস্থিতি

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রধান স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লোকজনের মধ্যে করোনা পরীক্ষার আগ্রহ আগের তুলনায় কমে গেছে। যে কারণে তাদের নমুনা সংগ্রহও কিছুটা কমেছে।”

“বৃহস্পতিবার ৬৬ জন রোহিঙ্গার পরীক্ষা করা হয়েছিল, যার সবই নেগেটিভ রির্পোট এসেছে,” বলেন তিনি।

তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে তিন হাজার ১৮৯ জন রোহিঙ্গার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। যাদের ছয়জন মারা গেছেন।

এই হিসাবে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আক্রান্তের হার দুই শতাংশ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে সার্বিকভাবে বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের বেশি।

যদিও আরআরআরসি-র পরিসংখ্যানে রোহিঙ্গা শিবিরের প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে দাবি নূর খান লিটনের।

উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া অনেক রোহিঙ্গার হিসাব রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ। আর এই ভাইরাসে প্রথম রোগীর মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ ১৮ হাজার ৬৫৮ জন। আর মৃত্যু হয়েছে দুই হাজার ৮৩৬ জনের।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট এক কোটি ৫৬ লাখ ২৮ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন ছয় লাখ ৩৫ হাজারের বেশি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন