Follow us

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু বিচারবহির্ভূত হত্যার ধারাবাহিকতা

কামরান রেজা চৌধুরী ও আব্দুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2020-08-03
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে বাহারছড়া পুলিশ চেকপোস্টে স্থানীয় লোকজনের ভিড়। এই চেকপোস্টেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খান। ৩ আগস্ট ২০২০।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে বাহারছড়া পুলিশ চেকপোস্টে স্থানীয় লোকজনের ভিড়। এই চেকপোস্টেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খান। ৩ আগস্ট ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা অব্যাহত থাকার মধ্যে কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার কারণে সরকার এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে, যা অন্যান্য ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় না।

এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মাদক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই ধারাবাহিকতায় সাবেক মেজর সিনহা রাশেদ খান (৩৬) হত্যার শিকার হলেন।

এই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করবে। দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ফেরার পথে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা। রোববার এ ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটিকে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “প্রথম কথা হলো, আমরা পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর কাছ থেকে দুই ধরনের ব্যাখ্যা পাচ্ছি। পুলিশ বলছে, তল্লাশিতে সহায়তা না করে ওই সেনা কর্মকর্তা তাঁর পিস্তল উঁচিয়ে পুলিশকে ভয় দেখিয়েছেন। সে কারণে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে মেজর সিনহাকে গুলি করেছে।”

“আবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তল্লাশির সময় হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নেমেছিলেন সিনহা। তারপরও তাঁকে গুলি করেছেন এসআই লিয়াকত,” বলেন তিনি।

“প্রকৃতপক্ষে কোনো বক্তব্যই পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়,” বলেন ড. মিজান।

পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া আসল সত্য বের করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কমিটিতে দুই পক্ষের প্রতিনিধি থাকার কারণে প্রকৃত ঘটনা হয়তো বের হবে।”

“পুলিশ হরহামেশা মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে “মানুষ হত্যা করছে,” মন্তব্য করে অধ্যাপক মিজান বলেন, “আমরা পুলিশসহ অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স দিয়েছি। ওই এসআই এই কারণে হয়তো গুলি চালিয়েছেন বলা যায়।”

তাঁর মতে, “এমন হত্যাকাণ্ড কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর তদন্তের স্বার্থে ওই তদন্তকেন্দ্রের সকল পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করা “একটি ভালো উদ্যোগ” বলে মন্তব্য করেন ড. মিজানুর রহমান।

তবে তাঁর মতে, “গত ৩০ দিনে ৩৬ জন মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের কারও জন্য কোনও তদন্ত হয়নি; কাউকে ক্লোজ করা হয়নি।”

“বাংলাদেশে বিচার পেতে গেলে আপনাকে ক্ষমতাবান হতে হবে—এই ঘটনা থেকে এটিই প্রমাণিত হয়। যাদের ক্ষমতা নেই, তাঁদের জীবনের কোনো দাম নেই,” বলেন ড. মিজানুর রহমান।

তবে ঘটনার পর পুলিশ মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল বলে মনে করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন।

“কারণ, আমরা অতীতে দেখেছি যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ নিহত ব্যক্তির লাশের পাশে ইয়াবা, গাঁজা, মদ, ভাঙ্গা পিস্তল দিয়ে তাঁকে অপরাধী হিসাবে চালিয়ে দেয়,” বেনারকে বলেন নূর খান লিটন।

তিনি বলেন, “সাবেক ওই মেজরকে হত্যার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাঁর গাড়িতে ইয়াবা, গাঁজা, মদ পাওয়া গেছে।”

কক্সবাজার এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই অঞ্চলে কয়েকশ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে জানান নূর খান লিটন।

তিনি বলেন, “সেকারণে পুলিশসহ সকল আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা মনে করেন, তাঁরা হত্যা করলে কিছুই হবে না। আর সেকারণে সবাই হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত হয়।”

“টেকনাফের একজন কমিশনারকে ধরে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি,” বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে ২৬ মে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে র‌্যাবের সাথে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফ যুবলীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলর মোহাম্মদ একরামুল হক।

তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম রোববার বেনারকে বলেন, “সাবেক মেজর নিহত হওয়ার পর সরকারকে খুব তৎপর দেখা গেছে। এমনকি এই ঘটনা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু আমার স্বামী আওয়ামী লীগের নেতা এবং পৌর কাউন্সিলর থাকা অবস্থায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আমরা কোনো বিচার পাইনি।”

কী বলছে সেনাবাহিনী?

গত ১ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর এ ঘটনা সম্পর্কে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এতে বলা হয়, গত ৩১ জুলাই আনুমানিক রাত এগারোটায় মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান মেরিন ড্রাইভ এলাকার শামলাপুর অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ডকুমেন্টারি ফিল্মের শুটিংয়ের কাজ শেষ করেন। এরপর পুলিশ চেকপোস্ট অতিক্রম করার সময় বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই লিয়াকত তাঁকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই গুলি করে হত্যা করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেজর সিনহা ৩ জুলাই ঢাকার বেসরকারি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিনজন ছাত্রছাত্রীসহ একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত ভিডিও তৈরির জন্য কক্সবাজার গিয়েছিলেন। তিনি ঘটনার সময় ফুলহাতা কম্ব্যাট গেঞ্জি, কম্ব্যাট ট্রাউজার এবং ডেজার্ট বুট পরা ছিলেন।

“সামরিক পোশাক পরা থাকা অবস্থায় মেজর (অব.) সিনহাকে গুলি করার পরই তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উত্থাপনের বিষয়টি ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা বলে অনুমেয়,” বলা হয় বিবৃতিতে।

প্রসঙ্গত মেজর সিনহা ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।

পুলিশ যা বলছে

এদিকে ঘটনার ব্যাপারে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সাংবাদিককের জানান, “ঈদের সময় দেশে জঙ্গি হামলা হতে পারে মর্মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্ক বার্তা রয়েছে। এ নিয়ে বাড়তি সতর্কতায় রয়েছে জেলা পুলিশ।”

তিনি বলেন, “এমন সময়ে শুক্রবার রাতে শামলাপুরের একটি পাহাড় থেকে নেমে আসা বোরকা সদৃশ বস্তু পরিহিত লোকজনের খবর শুনে পুলিশ হয়তোবা ডাকাত বা জঙ্গি সন্দেহ করে ওই গাড়িটি টার্গেট করে আসছিল।”

ঘটনা তদন্তের স্বার্থে শামলাপুর তদন্তকেন্দ্রের ১৬ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ শুরু হয়েছে। কমিটির সদস্যবৃন্দ ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছেন।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্র জানায়, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে জেলায় মোট ৬৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৫১ জন রোহিঙ্গা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন