Follow us

ডাকসুতে আবারো নির্বাচন চাইলেন নবনির্বাচিত ভিপি নুর

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-03-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন (বামে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নবনির্বাচিত ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। ১২ মার্চ ২০১৯।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন (বামে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নবনির্বাচিত ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। ১২ মার্চ ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) আবারো নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর।

তবে ফলাফল প্রকাশের পর পুনর্নির্বাচনের দাবি জানালেও সে দাবি থেকে সরে এসে মঙ্গলবার ভিপি নুরকে অভিনন্দন জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ।

এর প্রেক্ষিতে “ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, সেটা প্রত্যাহার করে নিলাম,” বলে ঘোষণা দিলেও সব পদে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন নুর।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে নুরুল হক নুর ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদ বাদ দিয়ে ডাকসুর বাকি ২৩ পদে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান। তিনি বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ছাত্রলীগের কেউ নির্বাচিত হবেন না।”

ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি ছাড়াও সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মোর্চা ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী। বাকি ২৩টি পদে নির্বাচিতরা সকলেই ছাত্রলীগের প্রার্থী।

“এই দাবি থেকে সরে আসার কোনো কারণ নেই। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোটা আন্দোলনকারীরা একটি-দুটি নয়, সবগুলো পদে জয় লাভ করবে,” বেনারকে বলেন ডাকসুর সাবেক দুই মেয়াদের ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না।

সোমবার ডাকসু নির্বাচন শেষ হওয়ার আগেই ছাত্রলীগ ছাড়া সব জোটের প্রার্থীরা পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন। সে সময় এই দাবিকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করলেও রাতে নুরকে ভিপি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণার পর ছাত্রলীগের অবস্থানও বদলে যায়।

তারাও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সামিল হয়ে ‘ফলাফল কারচুপির’ অভিযোগ তোলে এবং এই ভোটকে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ আখ্যা দেয়। বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এসে উপাচার্যের (ভিসি) বাসবভনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বেনারকে জানান, ছাত্রলীগের বিক্ষোভকারীরা ভিপির পাশাপাশি সমাজসেবা সম্পাদক পদেও পুর্ননির্বাচন চেয়েছেন।

তবে নির্বাচন বাতিল বা পুনরায় আয়োজন সম্ভব নয় বলে ওই সময় সাংবাদিকদের জানান ঢাবির উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ।

তিনি বলেন, “নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছে। পরাজিত হলে প্রতিক্রিয়া আসবেই। তবে ফল হাতে নয়, মেশিনে গণনা হয়েছে। সুতরাং কারচুপি বা অনিয়মের সুযোগ নেই।”

এর আগে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সফল নির্বাচন করেছি। যথাযথ নিয়ম নীতি অনুসরণ করেই সবকিছু হয়েছ।”
ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী আর রাজি বেনারকে বলেন, “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়েছে।” একই অভিমত মাহমুদুর রহমান মান্নার।

তিনি বলেন, “কুয়েত মৈত্রীসহ কয়েকটি হলের অনিয়ম সামনে এসেছে। অন্যগুলোতেও যে এমনটা হয়নি তার প্রমাণ কী?”

ধাওয়ার মুখে নতুন ভিপি

ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই ছাত্রলীগের ধাওয়ার মুখে পড়েন নুর ও তাঁর সহযোগীরা। রাজু ভাষ্কর্যের সামনে থেকে ধাওয়া খেয়ে তাঁরা টিএসসির (ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র) ভেতরে আশ্রয় নেন।

সেখানে নুরকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সমর্থিত ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া তৌহিদুর রহমান। এ সময় ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকসহ অন্যরা ছাত্রলীগ কর্মীদের পাল্টা ধাওয়া দেন।

পরে নুরের নেতৃত্বে টিএসসি থেকে মিছিল করেন বাম ও স্বতন্ত্র জোট এবং ছাত্রদলের নেতারা। টিএসসি থেকে কলাভবন ও মল চত্বর হয়ে রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে থামেন তাঁরা। সেখানে বক্তব্য দেন নুর।

তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে পুনর্নির্বাচনের আন্দোলন চালিয়ে যাব।” যদিও ছাত্রলীগ নমনীয় হওয়ার পরই তিনি কর্মসূচি প্রত্যাহার করে জানান, ছাত্রলীগ সভাপতির আশ্বাস এবং সৌজন্যমূলক আচরণে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এর আগে ক্লাশ-পরীক্ষা বর্জন করে সকাল থেকেই টিএসসি এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বামজোট সমর্থিত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ধর্মঘট পালনের অংশ হিসেবে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করে ছাত্রদলও সেখানে এসে অবস্থান নেয়।

নুরকে ছাত্রলীগের অভিনন্দন

ডাকসুর ভিপি পদে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন দুপুরে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থানরত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নুরকে ভিপি হিসেবে মেনে নেওয়ার আহবান জানান।

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার জন্য আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। নুরও আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।”

তাঁর আশ্বাসে নেতাকর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করার পর টিএসসিতে গিয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নুরের সঙ্গে কোলাকুলির পর শোভন সাংবাদিকদের বলেন, “২৮ বছরে পর আমাদের ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। আমরা চাই না এ নিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসে কোনও সমস্যার সৃষ্টি হোক।”

“নুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। তাই সব শিক্ষার্থীকে এই ফল মেনে নিতে হবে। আমি এই নির্বাচনের ফল সবাইকে মেনে নেওয়ার আহবান জানাই।”

এরই প্রেক্ষিতে নুর বলেন, “আমিও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চাই।”

সর্বশেষ সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভিপি বলেন, “প্রতিটি পদেই কারচুপি হয়েছে। তবে আমাদের পাশ করা এই দুই পদে কম হয়েছে, এছাড়া অন্য পদের সবগুলোতেই পুরোপুরি কারচুপি হয়েছে। তাই আমি আবারও সব পদেই পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।”

“৩১ মার্চের মধ্যেই আবার নির্বাচন দিতে হবে। তার আগে এই নির্বাচনের সাথে যারা ছিলেন তাঁদের পদত্যাগ করতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

একই সময়ে পুনর্নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, নির্বাচনের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও ভিসির পদত্যাগ দাবিতে সন্ধ্যায় তিন দিনের আল্টিমেটাম দেন বাম জোটের লিটন নন্দী। তিনি বলেন, “আমরা পাঁচটি প্যানেলের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো ঘোষণা করেছি।”

প্রসঙ্গত, নুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম নেতা।

“বেশ ক’বছর ধরে নানান অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যেও নুরকে শিক্ষার্থীদের দাবির নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। ফলে তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সহজতর হয়েছে,” বেনারকে বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী আর রাজি।

প্রার্থীদের নামে মামলা

রোকেয়া হলের প্রভোস্ট জিনাত হুদাকে লাঞ্ছিত করা এবং হলের ভেতরে ভাংচুর চালিয়ে ব্যালট ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুর ও বামজোট সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দীসহ সাত জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত অন্তত ৪০ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়েছে।

রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং নৃত্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মারজুকা রায়না বাদী হয়ে সোমবার (১১ মার্চ) রাতে শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের কারেন।

ওই রোকেয়া হলেই মারধরের শিকার হলে নুরকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সেখান থেকেই ফের ক্যাম্পাসে আসেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন