Follow us

‘মানবিক ভুলে’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পর্নো তারকা, ব্যবস্থা নেবেন শিক্ষামন্ত্রী

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার একটি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
ঢাকার একটি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

পর্নোগ্রাফির প্রচারের বিরুদ্ধে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের মধ্যেই এবার রাজধানীর একটি স্কুলের প্রশ্নপত্রে অপ্রাসঙ্গিকভাবে দুজন পর্নো তারকার নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সেই প্রশ্নের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছেন, বিষয়টি মানবিক ভুল। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন এ ধরনের ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিরও প্রমাণ বলে মনে করেন তাঁরা।

তাই দু’একজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়ে নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বেনারকে বলেন, “প্রশ্নপত্রে পর্নো তারকাদের নাম ব্যবহার যদি ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকে, তাহলে তা একটা অপরাধ। আর যদি অনিচ্ছাকৃত হয়ে থাকে তাহলে বলব, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা হওয়া উচিত নয়।”

তিনি বলেন, “শিক্ষকদের কাছে আমরা নীতি ও নৈতিকতার বিষয় প্রত্যাশা করি। তাঁদের কাছ থেকে যদি এই জিনিসগুলো আসে তাহলে আমাদের নতুন প্রজন্ম কোথায় যাবে? কাদের কাছে আমাদের সন্তানদেরকে লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব দিয়েছি।”

“নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়সন্ধির বয়স; তাদের শারীরিক, মানসিক গঠনের বয়স। সেই সময় এই ধরনের প্রশ্ন দিয়ে তাদেরকে কী বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে,” রাশেদা চৌধুরী বলেন।

এ ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তো বটেই, তাদের মনে শিক্ষকদের সম্মান করার জায়গাও থাকবে না বলেও মনে করেন তিনি।

বিষয়টিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম দৈন্যতারই প্রকাশ বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলী আর রাজী।

তিনি বেনারকে বলেন, “আমাদের স্কুলগুলোতে যেসব প্রশ্ন হয় সেগুলো খুব বিবেচনার সাথে করা হয় না। দ্রুততার সাথে, অদক্ষতার সাথে, যাচ্ছেতাইভাবে করা হয়। একটা স্কুল হয়তো নজরে এসেছে। এমনও হতে পারে এই প্রশ্নগুলো নোট বই থেকে নেওয়া।”

যা ঘটেছে

গত ১৭ এপ্রিল ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নবম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্রের বহু নির্বাচনি প্রশ্নপত্রের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়।

এতে দেখা যায়, ওই প্রশ্নপত্রের দুটি প্রশ্নের উত্তরের চারটি অপশনের একটিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবেক পর্নো তারকা সানি লিওন এবং অপর একটি প্রশ্নের অপশনের একটিতে লেবানিজ বংশোদ্ভূত পর্নো তারকা মিয়া খলিফার নাম দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতার নাম কী?’ – এমন প্রশ্নের সম্ভাব্য যে চারটি উত্তর দেওয়া হয়েছে, তার একটিতে রয়েছে ‘মিয়া কলিফা’র নাম। অন্য একটি প্রশ্ন ছিল ‘আম-আটির-ভেঁপু’ কার রচিত?’ এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরের একটি নাম ‘সানি লিওন’। এছাড়াও প্রশ্নপত্রে বেশ কিছু ভুল বানান ও অদ্ভুত সম্ভাব্য উত্তর রয়েছে।

এ বিষয়ে রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয় প্রকাশ সরকার বেনারকে বলেন, “এ ধরনের ভুল অনিচ্ছাকৃত। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পরেই আমাদের নজরে এসেছে।”

তবে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছেন ওই বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক শংকর চক্রবর্তী।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এটি মানবিক ভুল। আমি বুঝতেই পারিনি এটি এমন বিতর্ক তৈরি করবে। প্রধান শিক্ষকের পায়ে ধরে আমি ক্ষমা চেয়েছি। আর কখনো এমন ভুল হবে না।’

ব্যবস্থার আশ্বাস

ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট স্কুল এবং প্রশ্নকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপুমনি।

শুক্রবার সকালে রাজধানীর তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, “স্কুলের প্রশ্নপত্রে পর্নো তারকাদের নাম আসাটা অন্যায়। এটি শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

তিনি বলেন, “আমরা জেনেছি সংশ্লিষ্ট স্কুলের কোনো একজন শিক্ষক প্রশ্নপত্রটি করেছেন। কিন্তু এই ধরনের প্রশ্ন কেন হবে?”

“বহুনির্বাচনী প্রশ্নে অনেক রকমের নাম আসতে পারে। কিন্তু যে ধরনের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, নিশ্চয় সে ধরনের নাম কাঙ্খিত নয়। সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব,” বলেন দীপু মনি।

তবে শুধু দু’একজনকে শাস্তি নয়, মূল শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির দিকে নজর দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “এ বিষয়গুলো গণমাধ্যমে উঠে আসলে সরকার নড়েচড়ে বসে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে।”

“শিক্ষক বা যারাই কাজটা করেছেন তাঁতের নীতি-নৈতিকতা যদি এই হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এই শিক্ষকদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণে গোলমাল ছিল,” বলেন তিনি।

আলী আর রাজী বলেন, “এমন দু’একজন শিক্ষক ধরা পড়ে গেলে শাস্তি হয়, তবে তাতে শিক্ষাব্যবস্থার কিছু হয় না। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটাই খুব ত্রুটিপূর্ণ।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন