Follow us

করোনা মহামারিতে বদলে গেছে ঈদের চিরায়ত রূপ

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2020-07-31
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার বাজারে কোরবানির গরু নিয়ে আসছেন বিক্রেতারা। বুড়িগঙ্গা নদীর এই ছবিটি ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে তোলা। ৩০ জুলাই ২০২০।
ঢাকার বাজারে কোরবানির গরু নিয়ে আসছেন বিক্রেতারা। বুড়িগঙ্গা নদীর এই ছবিটি ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে তোলা। ৩০ জুলাই ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা শারমিনা সিরাজ। প্রতি বছর প্রকৌশলী স্বামী ফেরদৌস আহমেদ হাট থেকে কোরবানির গরু কিনে আনেন। দুই মেয়ে কোরবানির আগ পর্যন্ত দফায় দফায় সেই গরুর যত্ন নেয়।

“প্রতি বছর এই ঈদ ঘিরে আমাদের অন্যরকম প্রস্তুতি থাকে। গরু হাট থেকে আনার পর থেকে কতরকম তোড়জোড়। এবার হাটে যাওয়া নেই। গরু আসবে প্যাকেটে, হই চই বা উত্তেজনা নেই কোনো,” শারমিনা সিরাজ বেনার নিউজকে বলেন।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এ বছর বাসায় মেহমান আসার সম্ভাবনা কম। তাই নতুন কোনো আইটেম রান্নারও চেষ্টা করছেন না শারমিনা।

শনিবার বাংলাদেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের দুটি বৃহত্তম উৎসবের একটি ঈদ-উল-আযহা। একদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে বন্যা। শারমিনা সিরাজের পরিবারের মতো দেশের অগণিত পরিবারে এবার ঈদ অনেকটাই রংহীন, বিবর্ণ।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশগুলোর তালিকায় বিশ্বে ১৭তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে শনিবারও ২৪ ঘন্টায় ২৮ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বেলা আড়াইটার স্বাস্থ্য বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন আরও ২৭৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বেনজীর আহমেদ বলছিলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় বেড়াতে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ফেলতে হবে, জনসমাগম অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

“রোগে আক্রান্ত না হওয়ার চেষ্টা ঈদেও জারি রাখতে হবে,” বেনজীর আহমেদ বলেন।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয় এড়িয়ে ঢাকার ফুটপাতে শেষ মুহূর্তের ঈদের বাজার করছেন ক্রেতারা। ৩০ জুলাই ২০২০। [ফোকাস বাংলা]
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয় এড়িয়ে ঢাকার ফুটপাতে শেষ মুহূর্তের ঈদের বাজার করছেন ক্রেতারা। ৩০ জুলাই ২০২০। [ফোকাস বাংলা]

বদলে গেছে ঈদের চিরায়ত চিত্র

ঈদ-উল-আযহার প্রস্তুতির ধরন আলাদা। মূলত, ঈদের দুদিন আগে পবিত্র হজ পালন টিভিতে দেখেন অনেকে। অনেকের চোখ টিভিতে আটকে থাকে হজ করতে যাওয়া স্বজনটিকে একনজর দেখা যায় কি না, সেই উদ্দেশ্যে।

এ বছর সৌদি আরবের বাইরের কোনো দেশ থেকে হজ করতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। হজের যে দৃশ্য বাংলাদেশিরা দেখে অভ্যস্ত, তার সঙ্গে এবারের দৃশ্যে মিল নেই। জনসমাগমহীনে হজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন অনেকে।

এ বছর ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না ঈদগাহে। নির্দেশনা এসেছে মসজিদে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের নামাজ আদায়ের। নিষেধাজ্ঞা এসেছে কোলাকুলিতেও।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ কমকর্তা শায়লা শারমিন জানান, এ বছর ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে বায়তুল মোকাররমে সকাল সাতটায়।

“ভিড় এড়াতে পাঁচটার পরিবর্তে ছটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ধর্ম মন্ত্রণালয় সবাইকে বাসা থেকে ওজু করে মাস্ক পরে মসজিদে যাওয়া, নামাজ শেষে কোলাকুলি বা হাত মেলানোয় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে,” শায়লা শারমিন বেনারনিউজকে বলেন।

কোরবানির পশুর জন্য হাহাকার ঢাকায়

কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে বছরজুড়ে দেশের নানা প্রান্তের খামারিরা পশু লালন-পালন করেন। অনেকেরই লক্ষ্য থাকে ঢাকাসহ দেশের বড় হাটগুলো। ঈদের আগের রাত পর্যন্ত চলে জমজমাট বেচাকেনা।

শুক্রবার সকাল থেকে গাবতলি, শনির আখড়া ও পুরান ঢাকার ধোলাইখাল একরকম খাঁ খাঁ করছিল। যাঁরা কোরবানির পশু কিনবেন কি না দ্বিধায় ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত হাটে গিয়েছেন তাঁদের কাউকে কাউকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

শাহীদ আখতার প্রতিবছর পাবনার ঈশ্বরদী ও ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থেকে কোরবানির পশু আনেন ঢাকায়। তিনি বলছিলেন, এ বছর ঢাকায় ঈদে অনেকেই কোরবানির পশু কিনবেন না এমন একটা প্রচার ছিল। তাই খামারিদের অনেকেই গরু বিক্রি করেননি।

“গত বছর আমি নিজেই ৩২ টি গরু ঢাকায় এনেছিলাম, এবার এনেছি পাঁচটা। সকাল থেকে অনেকেই ফোন করে গরু চেয়েছেন। না করে দিলাম,” শাহীন আখতার বেনারনিউজকে বলেন।

কোরবানি উপলক্ষে আনুষঙ্গিক আরও নানাকাজে অল্প-বিস্তর রোজগার করেন অনেকে। ব্যস্ততা বাড়ে দা-বটি-ছুরি বা শিলপাটা ধার করানো মানুষের। অনেকে পশুখাদ্য, মাংস রাখার চাটাই বা কাটার জন্য কাঠের গুঁড়ি নিয়ে বসে পড়েন রাস্তার ওপরেই। এই দৃশ্য এ বছর ছিল একরকম অনুপস্থিত।

কসাইরাও হতাশ। কথা হচ্ছিল আনিস কসাই এর সঙ্গে। তিনিও এসেছেন পাবনার ঈশ্বরদী থেকে। বললেন, এ বছর পশু কাটাকাটির বায়না পেয়েছেন খুব কম।

“আমি গত চার বছর ধরে ঢাকার তিন জায়গায় কাজ করি। একেকটি গরু বানাতি ৮-১০ হাজার টাকা করে নিই। গড়ে ১৫-২০ টা গরু বানাই, এবার বায়না পেয়েছি সাতটির। দলে ছজন মানুষ,” আনিস কসাই বেনারকে বলেন।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার অনেকেই বাড়ি যাচ্ছেন না। ফলে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও চিরাচরিত ভিড় নেই। ৩১ জুলাই ২০২০। [বেনারনিউজ]
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার অনেকেই বাড়ি যাচ্ছেন না। ফলে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও চিরাচরিত ভিড় নেই। ৩১ জুলাই ২০২০। [বেনারনিউজ]

কেউ কেউ বাড়ির পথে

আকাশ, সড়ক, নৌ পথ কোথাও সেই অর্থে ভিড় নেই। মাত্র ১৭টি রুটে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। যদিও বৃহস্পতিবার বিকেলের পর থেকে বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটে ভিড় দেখা গেছে। ঈদের আগেরদিন যানজট দেখা দিলেও তা ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় কম।

সায়মা বেগম ঢাকায় একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত আছেন।

“ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে বাসে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি লাগে না। ঈদে সাত-আটঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। এবার থাকতে হয়েছে ঘণ্টা দেড়েক,” সায়মা বেনারকে বলেন।

তবে দুর্ভোগে পড়েছেন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়া মানুষেরা। বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ শিমুলিয়া কাঁঠালবাড়িতে ১৬ টি ফেরির মধ্যে ১০টি চালু রেখেছে। পদ্মার প্রচণ্ড স্রোতের কারণে সবগুলো ফেরি তাঁরা চালাতে পারছেন না। ফলে অনেককেই পাটুরিয়া দৌলতদিয়া হয়ে বাড়ি যেতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা

ঈদের অনেক আনন্দ আয়োজন বাদ দিতে হলেও শুভেচ্ছা জানানোয় কমতি নেই। এর মধ্যেই অনেকে অবাক হয়েছেন নিজেদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মুঠোফোনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা বার্তা পেয়ে।

প্রধানমন্ত্রী প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অডিও বার্তায় দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এটি মোবাইল ব্যবহারকারীদের কাছে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে।”

বুধবার ওই শুভেচ্ছা বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আসসালামুআলাইকুম, আমি শেখ হাসিনা। বছর ঘুরে আবার পবিত্র ঈদুল আযহা আমাদের মাঝে এসেছে। আমি পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে আপনাকে ও আপনার পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।”

মুঠোফোনে পাঠানো ওই বার্তায় তিনি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুরক্ষিত থাকার আহ্বান জানান।

বন্যায় প্লাবিত দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা

বৃষ্টি ও উজান থেকে ভেসে আসা ঢলে দেশের এক তৃতীয়াংশ জেলা প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের হিসাবে আরও কমপক্ষে ১২ টি জেলায় বন্যার আশঙ্কা আছে।‌ যেসব জায়গায় বন্যার পানি কমছে সেখানে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন।

শুক্রবার পানিসম্পদ মন্ত্রী জাহিদ ফারুক বরিশালের কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনে যান। তাঁর আশা উজান থেকে আসা ঢল বন্ধ হলেই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন