Follow us

একতরফা নির্বাচনে সব জেলা পরিষদ সরকারের দখলে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-12-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকা জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬।
ঢাকা জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬।
নিউজরুম ফটো

দেশের ২১টি জেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ২৫টি জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। এই ৪৬টি জেলার বাইরে বাকি ১৩ জেলায়ও আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান নেতারা বিজয়ী হয়েছেন, যদিও তাঁরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিতি পান।

গতকাল বুধবার পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাদে ৬১ জেলায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অনিয়মের অভিযোগে দুটি জেলা—বগুড়া ও কুষ্টিয়ায় চেয়ারম্যান পদে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। বাকি ৫৯ জেলা পরিষদ গঠন চূড়ান্ত হয়েছে গতকালের পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে।

দেশে মোট জেলার সংখ্যা ৬৪টি, যার প্রত্যেকটিতে একজন করে চেয়ারম্যান ও ২০ জন করে সদস্য থাকবেন। সদস্যদের মধ্যে ১৫ জন সাধারণ আসনে এবং ৫টি সংরক্ষিত আসনে ৫ জন নারী সদস্য থাকবেন।

পার্বত্য তিন জেলার প্রশাসন কিছুটা আলাদা, সেখানে প্রত্যেক জেলায় রয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ।

দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে বড় কোনো বিরোধী দল অংশ নেয়নি। এর কারণ পরোক্ষ এই নির্বাচনে অন্য দলের বিজয়ী হওয়ার সুযোগই ছিল না। এই নির্বাচনের ভোটার ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, মোট ভোটার ছিল ৬৩ হাজার ১৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪৮ হাজার ৩৪৩ এবং নারী ১৪ হাজার ৮০০ জন।

নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১৪৬, সংরক্ষিত সদস্য পদে ৮০৬ এবং সাধারণ সদস্য পদে ২ হাজার ৯৮৬ জন প্রার্থী ছিলেন।

নির্বাচনে উড়েছে টাকা

প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদের এই নির্বাচন ঘিরে টাকা ওড়ার অভিযোগ ওঠে। গত মঙ্গলবার একজন প্রার্থীর সমর্থককে টাকাসহ গ্রেপ্তার করে সাত দিনের জেল দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত সোমবার টাকা লেনদেনের সময় দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়।

সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার নির্বাচনে টাকা–পয়সা লেনদেনের কথা স্বীকার করেন। এ নিয়ে ফেসবুকেও আলোচনা–সমালোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট নাগরিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বেনারকে বলেন, “এই নির্বাচনের সঙ্গে টাকার খেলা হয়েছে। একদিকে এই নির্বাচন ছিল এক দলীয়, আরেকদিকে টাকা উড়েছে, উপহার বিতরণ হয়েছে। তাই নির্বাচনের নামে কার্যত প্রহসন হয়েছে।”

বিদ্রোহীদের জয়ের নেপথ্যে

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনে ১৩ জেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছেন স্থানীয় মন্ত্রী ও সাংসদেরা। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ৩০ জেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থিত প্রার্থীর বাইরেও ৫০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ১৩ জন বিজয়ী হন। তবে বিদ্রোহীরাও আওয়ামী লীগের সাবেক বা বর্তমান নেতা।

কয়েকটি জেলায় সরকার মনোনীত প্রশাসকদের মনোনয়ন দেওয়া হলেও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা জিততে পারেননি। কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে।

পিরোজপুরে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. শাহ আলম পরাজিত হয়েছেন। এখানে বিজয়ী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিদ্রোহী প্রার্থী মহিউদ্দিন মহারাজ। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহ আলমের বিপক্ষে কাজ করেছেন।

জামালপুরে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয়ী ফারুক আহম্মেদ চৌধুরীকে দলের সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করেছিল জেলা আওয়ামী লীগ। তাঁর পক্ষে অবস্থান ছিল বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের। কিন্তু কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয় এইচ আর জাহিদ আনোয়ারকে।

চুয়াডাঙ্গায় সাংসদ আলী আজগার টগরের সমর্থনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ শামসুল আবেদীন খোকন বিজয়ী হয়েছেন।

পঞ্চগড় জেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন আটজন। আওয়ামী লীগের সাংসদ নুরুল ইসলাম সুজন জয়ী হতে পারেননি। জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. আমানুল্লাহ।

নড়াইল জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সোহরাব হোসেন বিশ্বাস বিজয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সৈয়দ আইয়ুব আলী ছিলেন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।

শেরপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিশাল ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবীর।

মেহেরপুর বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম রসুল জয়ী হয়েছেন। পরাজিত হয়েছেন সাবেক প্রশাসক মিয়াজান। দলের সমর্থন পেয়েছেন সাবেক প্রশাসক মিয়াজান আলী।

সুনামগঞ্জে বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা মুকুট জয়ী হয়েছেন। দলের সমর্থন পাওয়া সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক এনামুল কবীর ইমন অর্ধেক ভোট পেয়েছেন।

নীলফামারীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়নাল আবেদীন ৪৪২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। পরাজিত হয়েছেন দলের সমর্থন পাওয়া ও সাবেক প্রশাসক মমতাজুল হক।

অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। সেখানে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান।

রাজশাহী ও চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর কপাল পুড়েছে বিএনপি-জামায়াতের ভোটে। সেখানে বিদ্রোহীরা জিতেছে।

গতকাল যে ৫৯ টি জেলা জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে, সেখানে একমাত্র নারী চেয়ারম্যান হলেন ছফিয়া খানম। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে রংপুর থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে

নির্বাচন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, জেলা পরিষদের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

“ভোটারের সংখ্যা কম থাকায় গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কোনো ভোটার যাতে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল না মারেন এবং ব্যালটের ছবি তুলতে না পারেন, সে জন্য বিশেষ চেষ্টা ছিল,” জানান সিইসি।

অন্যদিকে নির্বাচন শেষে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকবে।

নির্বাচন সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “এই নির্বাচনে পেশিশক্তির বিষয় যেহেতু ছিল না, সেহেতু ভোট কেনাবেচা হয়েছে। মন্ত্রী–সাংসদেরাও যে যার মতো নিজের লোকদের বিজয়ী করার চেষ্টা করেছেন।” তাঁর মতে, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে সহিংসতাসহ আরও অনেক কিছুই হতে পারত।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন