Follow us

জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক করার আহ্বান ইইউ’র

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-02-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
শেয়ার দিন
ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধিদল।
ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধিদল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
সৌজন্যে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কমিটির সভাপতি জিন ল্যাম্বার্ট। বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচার শুরু করলেও বিরোধীদল বিএনপির চাপে থাকার বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।

চারদিনের সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন জিন ল্যাম্বার্ট। ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত রেনসে তেরিঙ্কও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এই সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে নির্বাচনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও স্বচ্ছ হয় সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিও আহ্বান জানান জিন ল্যাম্বার্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এটাই যে, বিরোধী দল সরকারি দলের তুলনায় বেশ চাপে থাকে। তবে সেসব প্রতিকূলতা পেরিয়েই রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি বিরোধী দলকে রাখতে হয়।”

বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ

আগামী ডিসেম্বরে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সম্প্রতি এক ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করেছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে রয়েছেন দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের এমন বিপরীত অবস্থানে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন-এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হন ল্যাম্বার্ট।

উত্তরে তিনি বলেন, “এমন অবস্থায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল সেটা আমরা মানছি। খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড আদালতের বিষয় হওয়ায় সেটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে এ পরিস্থিতি অবশ্যই তাঁর (খালেদা জিয়া) দলের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।”

“এরপরও আমি মনে করি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নির্বাচনে মনোযোগ দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং মন্তব্য করে তিনি বলেন, এরপরও তাঁরা চান আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

ঢাকায় জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে প্রতিনিধি দল।

সফরের শেষ দিনে সংবাদ সম্মেলনের আগে দলটি নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে বৈঠক করে। সবশেষে ঢাকা ছাড়ার আগে বিএনপি জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা

আসছে দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অতীতের চেয়ে কম প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ইইউ প্রতিনিধি প্রধান। সেই সঙ্গে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির আহ্বানও জানান তিনি।

আর এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মনে করেন ল্যাম্বার্ট।

“দলকে সংগঠিত করা, প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে তাঁদের চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো আমরা জানি। এ কারণেই এসব বিষয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় তুলেছি,” তিনি বলেন।

তিনি বলেন, “আসন্ন নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের পরিধির মধ্যে তাঁদের দায়িত্ব পালন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের বাজেট, সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো এবং সামগ্রিকভাবে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।”

জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, “নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। বাংলাদেশের জনগণকে ব্যালট বক্সে নিজেদের মতের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ দিতে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হবে বলে আমরা আশা করি। এটাই জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

গত নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক না হওয়ায় ইইউ পর্যবেক্ষক পাঠায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আসবে ইইউ থেকে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক–সুজন এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “আমরা নিজেরাও জানি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশঃ জটিল হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা আগে জরুরি। অন্যথায় আবারও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।”

রোহিঙ্গা সমস্যায় পাশে থাকবে ইইউ

সফরকালে ১১ সদস্যের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শরণার্থী সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তাঁরা।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ল্যাম্বার্ট বলেন, আগামী মার্চে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পরের অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নতুন প্রস্তাব পাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগে চলতি মাসের শেষে এই সমস্যা নিয়ে বৈঠকে বসবেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ভূমিধসসহ নানা কারণে ঝুঁকির মধ্যে আছে রোহিঙ্গারা। এদিকে প্রাথমিক আন্তর্জাতিক সহায়তার মেয়াদও শেষ হতে চলেছে। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য পরবর্তী পর্যায়ের তহবিল জোগানোর বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ল্যাম্বার্ট। তিনি বলেন, “নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠকে তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে উদ্বেগর কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে নাগরিক সমাজের মত প্রকাশের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা তাঁদের।”

“সরকারের সঙ্গে বৈঠকে আমরা বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিলাম। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস পেয়েছি যে, সংশোধনের পর ওই আইন চূড়ান্ত করা হলে তা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। আমরা চূড়ান্ত আইনটি দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।”

মন্তব্য (0)
পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন