Follow us

দুঃখ যায়নি ভারতে যুক্ত সাবেক ছিটমহলবাসীদের

পরিতোষ পাল ও শরীফ খিয়াম
কলকাতা ও ঢাকা
2018-07-31
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কোচবিহারের দিনহাটায় অস্থায়ী শিবিরে তিন বছর ধরে এভাবেই টিনের ঘরে দিন কাটছে বাংলাদেশ থেকে আসা ভারতীয় সাবেক ছিটের বাসিন্দাদের। ২৩ মার্চ ২০১৮।
কোচবিহারের দিনহাটায় অস্থায়ী শিবিরে তিন বছর ধরে এভাবেই টিনের ঘরে দিন কাটছে বাংলাদেশ থেকে আসা ভারতীয় সাবেক ছিটের বাসিন্দাদের। ২৩ মার্চ ২০১৮।
বেনারনিউজ

ছিটমহল বিনিময়ের তিন বছর হয়ে গেলেও দুঃখ দূর হয়নি ভারতে অন্তুর্ভুক্ত হওয়া ছিটমহলবাসীদের। অন্য দিকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেয়ে দারুণ খুশি বাংলাদেশের বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীরা।

ভারতে যুক্ত সাবেক ছিটমহল এবং অস্থায়ী শিবিরগুলো ঘুরে এসে বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের সম্পাদক কিরীটী রায় বেনারকে বলেন, “এক অসহনীয় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা।”

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সামান্য ব্যবস্থা হলেও জীবনধারণের ন্যূনতম অধিকার হিসেবে যে সব সুযোগ সুবিধা পাওয়া উচিত ছিল তার কিছুই তাঁরা তিন বছরেও পায়নি।”

“কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার এদের নাগরিক অধিকারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা পূরণ তো করেইনি, বরং উদাসীন মনোভাব দেখাচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

একই অভিযোগ সাবেক ছিটবাসীদের। দিনহাটার অস্থায়ী শিবিরে থাকা কাচুয়া বর্মণ বেনারকে বলেন, “আমরা অনেক আশা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলাম মুক্ত ও স্বাধীন জীবন কাটাব বলে। কিন্তু এখন সরকার আমাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।”

বাংলাদেশ থেকে আসা সাবেক ভারতীয় ছিটের বাসিন্দাদের অস্থায়ী শিবিরে প্রত্যেক পরিবারের জন্য একটি টিনের ঘর বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানান কাচুয়া বর্মণ।

তিনি বলেন, “১০ ফুট বাই ১০ ফুটের সেই ঘরে সাত জনের পরিবারও যেমন রয়েছে তেমনি ১০ জনের পরিবারও গাদাগাদি করে রয়েছে।”

“পরিবারের জনসংখ্যা যাই হোক না কেন, মাসিক রেশন বরাদ্দ সব পরিবারের জন্য একই। ফলে বড় পরিবারের সকলের দু’বেলা খাবারও জোটে না,” যোগ করেন তিনি।

কাচুয়া আরও বলেন, “শিবিরে স্বাস্থ্য পরিষেবা বলে কিছু নেই। ছেলে মেয়েদের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। পানীয় জলও অপ্রতুল। কাজেরও সুযোগ নেই।”

তবে ছিটবাসীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্র নাথ ঘোষ বেনারকে বলেন, “সাবেক ছিটগুলিতে ব্যাপক উন্নয়নকাজ হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার, স্কুল, বাসস্ট্যান্ড থেকে রাস্তাঘাট, এমনকি অডিটোরিয়াম সবই হচ্ছে। তবে সময় দিতে হবে।”

এদিকে এখনো তাঁদের নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট বা জমির স্বত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ছিটমহলবাসীদের। এছাড়া স্থায়ী পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসও ভারত সরকার পূরণ করেনি বলে জানান তাঁরা।

তবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট তলবের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ জুলাই কোচবিহারের জেলা শাসক কৌশিক সাহা এক চিঠিতে জানান, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে সব ছিটবাসীকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক ফলনাপুর ছিটের বাসিন্দা বিজেন্দ্র কুমার বর্মণ বেনারকে বলেন, “নাগরিকত্ব চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে কোনো কাগজ দেওয়া হচ্ছে না।”

এদিকে ছিটবাসীরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সব সুবিধাই ভোগ করছে দাবি করে “এর পর আর নাগরিকত্বের সনদ কী প্রযোজন,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ।

তিনি বলেন, “সাবেক সব ছিটবাসীকে রেশন কার্ড, আঁধার কার্ড, জব কার্ড, খাদ্যসাথী কার্ড, সব দেওয়া হয়েছে। একজন ভারতীয় নাগরিক যেসব সুযোগ-সুবিধা পায় তার সবই এরা পাচ্ছেন। তাঁরা সকলেই তালিকাভুক্তও রয়েছেন। এর পর আর নাগরিকত্বের সনদ কী প্রযোজন।”

বাংলাদেশে ভিন্ন চিত্র

বাংলাদেশের বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের সরকার প্রচুর সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে বলে বেনারকে জানান ছিটমহল বিনিময় বিষয়ক বাংলাদেশি গবেষক তুহিন ওয়াদুদ।

“সেখানে এমন কোনো বয়স্ক বা বিধবা নেই যে ভাতা পাচ্ছে না। ভিজিডি (ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট) কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে প্রত্যেক মাসে চাল দেওয়া হচ্ছে।”

“যারা একটু শিক্ষিত, তারাই সরকারি চাকরি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক ছিটমহলবাসীর জন্য আলাদা কোটা না থাকলেও তাঁদের প্রতি বাড়তি সহমর্মিতা দেখাচ্ছেন নিয়োগকর্তারা,” বলেন তুহিন।

“সরকারের সব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে সাবেক ছিটমহলগুলোকে অগ্রাধিকার দেবার নির্দেশনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে ওই সব এলাকার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছেন,” বেনারকে জানান লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আমিনুর রহমান।

তবে সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট পেলেও এখনো অর্থনৈতিকভাবে সাবেক ছিটমহলবাসী স্বাধীন হতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তুহিন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোও (বিবিএস) বলছে, আর্থসামাজিক বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে আছে এসব এলাকার মানুষ।

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে মিশে গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে ৫১টি বাংলাদেশি ছিট ভারতে এবং ১১১টি ভারতীয় ছিট বাংলাদেশের যুক্ত হয়েছে।

বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী, ছিটবাসীরা তাদের পছন্দমতো দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার সুযোগ পান। তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলো থেকে ৯২১ জন ভারতে চলে আসেন। তবে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের কোনো বাসিন্দা বাংলাদেশে ফিরে যাননি।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা ছিটমহলবাসীদের কোচবিহার জেলার দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ ও হলদিবাড়িতে টিনের তৈরি তিনটি অস্থায়ী শিবিরে রাখা হয়েছে।

এদিকে আন্দোলন, ওদিকে উৎসব

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুবিধা না পেয়ে ভারতের সাবেক ছিটবাসীরা এবার বৃহত্তর আন্দোলনের পথে পা বাড়াতে চলেছেন। ‘আমরা ছিটমহলবাসী’ নামে সংগঠন তৈরি করে তারা কোচবিহার সদরে আগামী মাসে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি এবং সমস্ত ছিটবাসীকে নিয়ে সমাবেশ ও মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নাগরিক অধিকার বঞ্চিত সাবেক ছিটবাসীরা গত মে মাসে অনুষ্ঠিত পঞ্চায়েত নির্বাচন বয়কট করেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বেনারকে বলেন, “পরিকল্পনা সঠিক না হলে যা হয়, এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের ভূমিকা পালন করেননি বলেই সাবেক ছিটবাসীরা তিন বছর পরেও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”

অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন নাগরিকেরা ছিটমহল বিনিময়ের তিন বছর পূর্তি উদ্‌যাপনের জন্য তৈরি হচ্ছেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাফ হোসেন বেনারকে বলেন, “এবার ব্যাপক আয়োজনে দিনটি উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত ১২টা অবধি আনন্দ উৎসব করার জন্য দাসিয়ারছড়াকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।”

“প্রতিবছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস যেভাবে পালিত হয়, সেভাবে ছিটমহল স্বাধীনতা দিবস পালিত হবে,” উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “মুক্ত হয়ে আমরা সুখ পাচ্ছি, সেটা ধরে রাখতে চাই।”

“বুধবারও (পহেলা আগস্ট) নানা আয়োজনে দিনভর আনন্দ উদযাপন করবে বাংলাদেশের সাবেক ছিটমহলবাসীরা,” বলেন আলতাফ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন