ঢাকার নদী দূষণকারী দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের নির্দেশ

শরীফ খিয়াম
2020.01.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
200121_River_pollution_1000.JPG আশপাশের দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। ২২ মার্চ ২০১৭।
[বেনারনিউজ]

দূষণ থেকে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার নদীগুলোকে বাঁচাতে আদালত দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা নিয়ে খুব আশাবাদী নন পরিবেশবাদীরা। তাঁরা বলছেন, বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা না থাকলে শুধু কারখানা বন্ধ করে নদী দূষণমুক্ত করা যাবে না।

পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা ২৩১টি শিল্প কারখানা বন্ধ করতে সোমবার পরিবেশ অধিপ্তরকে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।

পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) ২০১০ সালে করা এক রিট আবেদনের শুনানিকালে হাই কোর্ট এই নির্দেশ জারি করে।

তবে শুধু ছাড়পত্রবিহীন কারখানা বন্ধ করলেই নদীগুলো দূষণমুক্ত হয়ে যাবে এমনটা মনে করছেন না পরিবেশবাদীরা।

এ প্রসঙ্গে নদী বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বেনারকে বলেন, “নদী, পানি বা পরিবেশ বিষয়ে আমাদের উচ্চ-আদালত সবসময়ই সোচ্চার। তারই আরেকটি নজির এই নির্দেশ। তবে এইসব কারখানা বন্ধ করে দিলেই নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাবে বা দূষণমুক্ত হয়ে যাবে, এমন নয়।”

“ছাড়পত্রধারী যেসব কারখানায় পানি বা বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট (ইটিপি) আছে, সেগুলোর সক্রিয়তাও নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, “আদালতের এই নির্দেশটি মূলত ‘প্রতীকী’। দীর্ঘদিন থেকেই ঢাকার প্রায় প্রতিটি শিল্প কারখানা নদী দূষণ করে আসছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটা মহাপরিকল্পনা দরকার।”

“এ বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত, গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করে টেকসই সমাধান দিতে হবে,” বলেন তিনি।

এই দুই বিশেষজ্ঞই নদীগুলোকে বাঁচাতে সরকারের সদিচ্ছাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সোমবার আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে আমাতুল করিম ও রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবু ইয়াহিয়া দুলাল।

এইচআরপিবি’র প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় পরিবেশ পদক পাওয়া আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বেনারকে বলেন, “২০১০ সালের মূল মামলাটি বুড়িগঙ্গার পানি দূষণ বিষয়ক হলেও ওই ৩২১টি প্রতিষ্ঠান ঢাকার চারদিকের নদী দূষণের জন্য দায়ী।”

মনজিল জানান, আলোচ্য মামলাটির প্রথম রায় হয় ২০১২ সালে। তখনই আদালত ছয় মাসের মধ্যে নদী দূষণকারী সব কারখানা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

এদিকে কারখানাগুলো বন্ধের আদেশ কার্যকর করে ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতেও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠি পাওয়ামাত্র ওইসব কারখানার পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ওয়াসা, তিতাস ও ডিপিডিসিকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। একই বেঞ্চ পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় গত নভেম্বরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের ২৭টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল।

এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মনজিল মোরসেদের অপর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছিল আদালত।

লিখিত আদেশের অপেক্ষায় অধিদপ্তর

আদালত থেকে লিখিত আদেশ পাওয়ার সাথে সাথেই পরিবেশ অধিদপ্তর কারখানাগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

“সাধারণত মৌখিকভাবে রায় ঘোষণার এক সপ্তাহ পরে লিখিত আদেশটি পাওয়া যায়। আশা করি আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আমরা রায়ের কপি পেয়ে যাব। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ‘অ্যাকশনে’ নেমে যাব,” বেনারকে বলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুর হক।

“ওইসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস, বিদ্যুৎ আর পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য আমাদের অফিস থেকে ওয়াসা, তিতাস ও ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হবে। চিঠির প্রেক্ষিতে তারা সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করে দিলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে,” বলেন তিনি।

দূষণমুক্তির একধাপ

এইচআরপিবির করা আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশ ঢাকার নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্রে একধাপ অগ্রগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে শেখ রোকন বলেন, “এটা ইতিবাচক যে নদীর সীমানার বাইরে গিয়েও নদী দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

“তবে নিয়ম হচ্ছে পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে কারখানা নির্মাণ শুরু হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি আগে থেকেই খেয়াল রাখলে নতুন করে কারো উৎপাদন বা কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ত না,” যোগ করেন তিনি।

ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) তরল বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে শরীফ জামিল বলেন, “ওয়াসার দূষণের দায় সরকার এড়াতে পারে না।”

তাঁর দাবি, “নদী দূষণের জন্য আইনে যে শাস্তির বিধান আছে সেটা খুবই সামান্য। এটা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডের বিধান রাখলে কারখানা মালিকদের দূষণ থেকে বিরত রাখা সহজ হবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।