ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত: রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার দায় নয়

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-04-09
Share
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত: রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার দায় নয় ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি (বামে)। ৯ এপ্রিল ২০২১।
[বেনারনিউজ]

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অসাধারণ উদারতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি।

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা থাকলেও শরণার্থীদের ‘একটি দ্বীপ’ দিয়ে দেবার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন তিনি।

শুক্রবার তাঁর সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফরকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বেনারনিউজের প্রশ্নের জবাবে এই মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির আলোকে আবারও বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে রক্ষার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতে চায় বলে উল্লেখ করেন জন কেরি। এই প্রচেষ্টায় ভারতও অংশীদার হতে সম্মত হয়েছে বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর কেরি গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। এসময় তিনি জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের জানান, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যারিস চুক্তিতে ফিরে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসা করেছেন।

আগামী ২২ ও ২৩ এপ্রিল জলবায়ু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ৪০টি দেশের বিশেষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে। করোনা মহামারির কারণে সম্মেলনটি হবে ভার্চুয়ালি।

‘রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার দায় নয়’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে কেরি সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন।

রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জন কেরি বলেন, “আপনারা তাঁদের একটি দ্বীপ (ভাসানচর) দিয়েছেন।” যদিও ভাসানচরের নাম উল্লেখ করেননি তিনি।

“বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের জন্য সহায়তা করছে। তবে এটা দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নয়। এটি তাদের সমস্যা সমাধান করবে না,” বলেন তিনি।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি ইঙ্গিত করে কেরি বলেন, নতুন মার্কিন প্রশাসন দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য “সবকিছু” করবে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর যে চাপ ও চ্যালেঞ্জ আছে, “সেটি কিছুটা কমবে।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের একার দায় নয়। এই বৈশ্বিক সংকট সমাধানে জাতিসংঘের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।”

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষস্থানে। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ১২০০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে। 

বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছেন। শিবিরগুলো থেকে এক লাখ শরণার্থীকে অধিকতর নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে নিজস্ব অর্থায়নে নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচর দ্বীপকে প্রস্তুত করে সরকার। 

শুরু থেকেই দ্বীপটির বাসযোগ্যতা বিষয়ে কারিগরি সমীক্ষার দাবি জানিয়ে আসছিল জাতিসংঘ। তবে সমীক্ষা ছাড়াই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আপত্তির মুখে গত ডিসেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর স্থানান্তর শুরু করে সরকার। এ পর্যন্ত সেখানে ১৮ হাজারের বেশি শরণার্থীকে স্থানান্তর করা হয়েছে। 

সম্প্রতি সেখানকার শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও জীবনযাপন দেখতে ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের ১০ জন রাষ্ট্রদূত ভাসানচর পরিদর্শন করেন। তবে পরিদর্শন শেষে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। 

এর আগে জাতিসংঘের একটি দলও ভাসানচর পরিদর্শন করে। তবে সফরের পর ভাসানচরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও কোনো মন্তব্য করেনি।

জন কেরিই প্রথম কোনো শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা যিনি ভাসানচর বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করলেন। 

জলবায়ু ইস্যুতে নেতৃত্বে ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র আবার প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ফিরে এসেছে উল্লেখ করে জন কেরি জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলায় সকল দেশের সহযোগিতা কামনা করেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দুর্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা এই বছর মানব ইতিহাসের কঠিন দিন, কঠিন সপ্তাহ, মাসগুলোর মুখোমুখি হয়েছি। বিশ্বব্যাপী মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, ভাইরাস, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে অনেক কিছু দেখছি।”

“এসব কারণে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বড়ো অর্থনীতির দেশ ও অংশীদারদের নিয়ে সম্মেলন আহ্বান করেছেন। প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নয়ন, আর্থিক বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার জন্য এই সম্মেলন খুবই কার্যকর হবে,” বলেন জন কেরি।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু ইস্যু থেকে পিছিয়ে পড়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন জলবায়ু ইস্যুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকায় পৌঁছান জন কেরি। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।

গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু জলবায়ু বিষয়ক এই সফরে তিনি বাংলাদেশ আসার আগে আবুধাবি ও নয়াদিল্লী সফর করেন। সফরকালে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ২৬তম সম্মেলন (কপ-২৬) নিয়েও তিনি দেশগুলোর সাথে আলোচনা করেন বলে জানান কেরি। 

দুই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, “১১ লাখ রোহিঙ্গার কারণে আমাদের বনাঞ্চল ও পরিবেশ-প্রতিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।”

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।

প্যারিস চুক্তিতে জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় প্রতিবছর দশ হাজার কোটি (একশ বিলিয়ন) ডলার তহবিল গঠনের কথা থাকলেও সে বিষয়ে অগ্রগতি খুবই কম উল্লেখ করে বৈঠকে জন কেরিকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ড. মোমেন। 

কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশ “সর্বনিম্ন পর্যায়ে” হলেও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় “বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে,” বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জিয়াউল হক।

“আমাদের দাবি, প্যারিস চুক্তির আলোকে কার্বন নিঃসরণ কমানো,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তা না হলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং বন্যা, ঝড় ও খরাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভর করবে।”

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বছরে সারা বিশ্বে ঝড়ে যত ক্ষয় ক্ষতি হয় তার পাঁচ ভাগের দুই ভাগই মোকাবেলা করতে হয় গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশকে। গত দুই দশকে সাইক্লোনে বৈশ্বিক প্রাণহানির প্রায় ৬০ ভাগই ঘটেছে বাংলাদেশে।

বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া নদী ভাঙনে বাংলাদেশে প্রতি বছর এক হাজার হেক্টরের মতো জমি হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশের তিন ভাগের দুই ভাগ এলাকারই উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ মিটারের কম। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে ফসলের জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে ব্যাপক ফসলহানির ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। 

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন