Follow us

তিন সপ্তাহে বন্যায় ৮৬ জনের মৃত্যু

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-07-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বগুড়ার ধুনট এলাকায় যমুনার পানি বেড়ে বন্যায় ডুবে যাওয়া রাস্তায় শিশু ও মালপত্র নিয়ে যাচ্ছেন দুই নারী। ২১ জুলাই ২০২০।
বগুড়ার ধুনট এলাকায় যমুনার পানি বেড়ে বন্যায় ডুবে যাওয়া রাস্তায় শিশু ও মালপত্র নিয়ে যাচ্ছেন দুই নারী। ২১ জুলাই ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

গত ৩০ জুন থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে বন্যায় ৮৬ জনের মৃত্যু হওয়ার খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল রুম। সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী সাত দিন দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।

দেশে ইতিমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে ২৪ জেলা, এর মধ্যে বন্যার পানি দেশের খাদ্য ভাণ্ডার উত্তারঞ্চলের ১৮ জেলার ৬৪ উপজেলার বেশ ক্ষতি করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বুধবার বেনারকে বলেন, “বর্তমানে বন্যার অবস্থা প্রায় পিক পর্যায়ে। উত্তরাঞ্চলীয় জেলাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলের মোট ১৮ জেলা মারাত্মক বন্যার কবলে। আগামী সাত দিন বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান প্রবণতায় পানি বৃদ্ধি পেলে আগামী সাত দিনের মধ্যে ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।”

আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট বুধবার জানিয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত এবং নেপালে প্রায় এক কোটি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৫৫০ জন মানুষ।

পরিবেশ ও বন্যা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বেনারকে বলেন, “এ বছর বন্যা একটি অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। কোভিডের কারণে মানুষ গত তিন মাস ধরে ঘরে বসে আছে। মানুষ বন্যা ও কোভিড দুই বিপদে আছে।”

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে বৃষ্টি হবে। আবার আসামে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। সেখানে বন্যা পরিস্থিতি খুব খারাপ অবস্থায়। আসামের বন্যার পানি বাংলাদেশ হয়ে নেমে যাবে। আর পানি নামতে সময় লাগবে। আমার মনে হয় পানি নামতে পুরো আগস্ট মাস লেগে যেতে পারে।”

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “২০১৯ সালেও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়। এ বছরও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হবে। তবে গত বছরের চেয়ে বেশি দিন থাকবে কি না সেটা বলা মুশকিল।”

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যা উপদ্রুত জেলাগুলো হচ্ছে: লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, ফেনী, শরীয়তপুর, ঢাকা ও নওগাঁ।

বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের পর এবারের বন্যা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘের কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স এমন আশঙ্কার কথা জানায়।

মঙ্গলবার সংস্থাটির নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আগস্ট মাসের আগে পানি কমতে শুরু করবে—এমন সম্ভাবনা কম।

সংস্থাটির হিসাবে, বন্যায় এখন পর্যন্ত দেশের ২৪ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে সরকারি আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ৫৬ হাজার মানুষ। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ বাড়িঘর ডুবে গেছে। বাঁধ এবং বাঁধের মতো সুরক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতিসংঘ এবং মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো জরুরি খাবার প্যাকেট, পানি পরিশোধন সুবিধা, স্বাস্থ্যবিধি ও নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদানে সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।

সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর সহায়তার জন্য কমপক্ষে পাঁচ দশমিক দুই মিলিয়ন ডলারের তহবিল দিয়েছে জাতিসংঘের সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ড।

বুধবার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে ৯৬ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সংস্থাটির মহাসচিব জাগান চাপাগাইন বলেন, প্রতিবছর মৌসুমি বন্যা হলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে বন্যা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

চাপাগাইন বলেন, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মানুষ বন্যা, করোনাভাইরাস ও চাকরি হারানোয় আর্থসামাজিক সংকটের ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট।

কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে ফসলের ক্ষতি কোভিড-১৯ মহামারিতে ইতিমধ্যেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে বলে তিনি জানান।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সরেজমিন শাখার পরিচালক ড. আলহাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বেনারকে বলেন, প্রথম পর্যায়ের বন্যায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

“প্রতিদিনই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষি খাতের ক্ষতি কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ যেমন, বিকল্প বীজতলা তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে বিকল্প ফসলের চাষের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

“এর ফলে বন্যার পানি নেমে গেলে দ্রুত ফসল চাষ শুরু সম্ভব হবে,” বলেন আলহাজ উদ্দিন আহাম্মেদ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন