Follow us

বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অ্যামনেস্টির অভিযোগ, সরকারের প্রত্যাখ্যান

বেনার ডেস্ক
ওয়াশিংটন ডিসি
2017-05-03
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার ঘটনায় ঢাকায় ছাত্র–ছাত্রী এবং ধর্মনিরপেক্ষ অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদ। এপ্রিল ০৮, ২০১৬।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার ঘটনায় ঢাকায় ছাত্র–ছাত্রী এবং ধর্মনিরপেক্ষ অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদ। এপ্রিল ০৮, ২০১৬।
AFP

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ধারাবাহিক আক্রমণের শিকার হওয়া ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও প্রকাশকদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো তাদেরকেই দায়ী করা হচ্ছে। আর এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কঠোর সমালোচনা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে প্রতিবেদনটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ওই সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিন্ন মত পোষণকারীদের সুরক্ষা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। হুমকিদাতা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও সরকার ব্যর্থ।

এদিকে প্রতিবেদনটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বুধবার ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেছেন, “অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওই প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যমূলক।”

মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “দমন পীড়ন এবং ভয়ের ফাঁদে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা।”

প্রতিবেদনে জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান এবং ধর্ম নিরপেক্ষ ব্লগারদের হত্যার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। এতে পাঁচজন ব্লগার, একজন প্রকাশক এবং একজন অনলাইন এক্টিভিস্টসহ অন্তত: সাতজনকে হত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞের শুরু। গত চার বছরে এসব হত্যা মামলার মাত্র একটিতে রায় এসেছে।

সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করছে বলে প্রতিবেদনে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে। আক্রান্তদের দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বক্তব্যকে বিশেষভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি বলেছে, ২০১৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার নিলয় চ্যাটার্জি খুন হওয়ার পর নিহত ব্যক্তির লেখাকেই দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, “জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কথা বলার অধিকার এদেশে কারও নেই। তুমি ধর্ম না মানলেও ক্ষতি নেই; কিন্তু তুমি অন্য কারও ধর্ম বিশ্বাসকে কটাক্ষ করতে পারবে না। এসব সহ্য করা হবে না।”

২০১৬ সালের এপ্রিলে নাজিমুদ্দিন সামাদ নিহত হলে তিনি ‘আপত্তিকর’ কিছু লিখেছিলেন কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল।

এ পর্যন্ত শুধু রাজীব হায়দার হত্যার বিচারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিলয় নীল (নিলাদ্রী), ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, আভিজিৎ রায় এবং ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার ঘটনায় ২৫ সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করেছে মানবাধিকার ওই সংগঠনটি।

প্রতিবেদনে সমকামিদের অধিকার আন্দোলনের কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তার বন্ধু মাহবুব তনয় হত্যার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।

অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য

যেসব ধর্ম নিরপেক্ষ লেখক বেঁচে আছেন তারা তাদের দু:সহ জীবন যাপনের কথা বিবৃত করেছেন অ্যামনেস্টির কাছে। তাদের অনেকে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন এক্টিভিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “আমার পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমার দুই সন্তান ভীতসন্ত্রস্ত। তারা সব সময় ভয়ে থাকে কখন, কে তাদের বাবাকে মেরে ফেলবে।”

আর একজন ব্লগার অ্যামনেস্টিকে বলেছেন যে, তিনি বাংলাদেশ না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও তাকে তার স্ত্রীসহ ২০১৫ সাল থেকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তারা আত্মরক্ষার তাগিদে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঠিকানা বদলান।

যা বিশ্বাস করি তা বলতে পারছি না

নিজেদের লেখা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজেরাই লাগাম টানতে বাধ্য হয়েছেন বলে অ্যামনেস্টিকে জানিয়েছেন অনেক ব্লগার।

খুনোখুনি শুরু হওয়ার পর থেকে বিপুল সংখ্যক ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন তারা লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকেই তাদের ব্লগ বন্ধ করে দিয়েছেন। ছদ্মনামেও তারা কিছু লিখতে সাহস পাচ্ছেন না বলে অ্যামনেস্টিকে জানিয়েছেন।

টেলিফোন আসে

সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন গণমাধ্যম কর্মীদের হুমকি দেয় বলে অ্যামনেস্টিকে জানিয়েছেন অনেক ভুক্তভোগী। বাংলাদেশের মিডিয়ায় এসব হুমকির বিষয়ে ফোন আসে।

সরকারি কর্মকর্তারা সরাসরি হুমকি দেন না। ফোনের মাধ্যমে কিংবা কথপোকথনে তারা সংবাদ প্রতিবেদন বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা বুঝিয়ে দেন।

ফৌজদারি আইন

বাংলাদেশের সংবিধানে বাক স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অথচ আইনের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ আছে।

২০০৬ সালে প্রণীত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করা হচ্ছে। এর কয়েকটি বিধান বিশেষ করে ৫৭ ধারা কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। এর ফলে যাকে তাকে অভিযুক্ত করা এবং সমালোচনার কন্ঠরোধ করা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ২০১৬ সালে শেখ হাসিনার সমালোচনা করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দিলীপ রায়কে গ্রেপ্তার করে প্রায় তিন মাস জেলে রাখার ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির সুপারিশ

বাংলাদেশের পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে তথ্য প্রযুক্তি আইন বাতিল অথবা সংশোধনসহ বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

মত প্রকাশের দায়ে গ্রেপ্তার সবাইকে মুক্তি দেওয়া এবং এ সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহার, নতুন মামলা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের নিরাপত্তা প্রদান, দ্বৈততা পরিহার করে সুস্পষ্ট ভাষায় হামলার নিন্দা জানানো এবং সাংবাদিকেরা যাতে ভয় ভীতি ও প্রভাব মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারেন, তার নিশ্চয়তা দাবি করা হয়েছে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদন সম্পর্কে বেনারের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

তবে প্রতিবেদনটিকে প্রত্যাখ্যান করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তারা একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি।”

তথ্যমন্ত্রী এমন প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টির আরও সতর্ক থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননও প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বেনারকে তিনি বলেন, “অ্যামনেস্টির ওই প্রতিবেদনে নতুন কিছু নেই। এসব চর্বিত চর্বন মাত্র। তারা একই কথা বারবার বলছে।”

মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ঘটেনি। আমরা এটা গ্রহণ করতে পারি না।

রাশেদ খান বলেন, “অ্যামনেস্টি প্রস্তাবিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা অস্বীকার সংক্রান্ত আইনটিরও বিরোধিতা করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি গণহত্যা অস্বীকারের বিরুদ্ধে আইন করতে পারে আমরা কেন পারব না?”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন