Follow us

ক্ষমতায় গেলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের অঙ্গীকার বিএনপির

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-08-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের সমাবেশ। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের সমাবেশ। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
[বেনারনিউজ]

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ‘অপব্যবহার’ হওয়ার তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে বিতর্কিত ওই আইনটি বাতিল করার জন্য সরকারকে চিঠি দেবে রাজনীতিতে বিরোধী দল বিএনপি। একই সাথে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এই আইনসহ মত প্রকাশের অন্তরায় হিসাবে চিহ্নিত সকল আইন বাতিল করবে দলটি।

শুক্রবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০০৬ সালে বিএনপিই প্রথম দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আদলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন পাশ করে, যার ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছিল।

“বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দল খুব ভালো ভালো কথা বলবে, কালো আইন বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেবে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কালো আইন আরও কালো করা হয়। এটা আওয়ামী লীগ–বিএনপি—দুটি দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য,” বেনারকে বলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ।

বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, “২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৫৩ জন মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলার অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবেন, সরকারি দলের লুটেরাদের বিরুদ্ধে কথা বললে, রাজনৈতিক মত প্রকাশ করলে, সরকারের সমালোচনা করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হচ্ছে।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার ভয়ে আজ জাতির কণ্ঠ রুদ্ধ। এটা জনগণের কণ্ঠরোধ করার জন্য সরকারের হাতিয়ার। তাঁরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই আইন করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, অবিলম্বে এই আইনটি বাতিল করা উচিত। কারণ জনগণের চিন্তা-ভাবনা, তার স্বাধীনতার প্রকাশকে নিশ্চিত করতে হবে।”

“আমরা এই আইন বাতিল করতে সরকারে চিঠি দেবো। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ স্বাধীন মত প্রকাশের প্রতিবন্ধক সকল আইন বাতিল করব,” বলেন বিএনপি মহাসচিব।

অপব্যবহারের অভিযোগ নাকচ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বেনারকে বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোনো অপব্যবহার হচ্ছে না। এই আইন করা হয়েছে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।”

তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধের শিকার হওয়ার পর মামলা করলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে। সুতরাং, এই আইন অপব্যবহার হচ্ছে না।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বেনারকে বলেন, “তথ্য প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে আমাদের সরকারের মনে হয়েছিল যে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। সেজন্য আইসিটি আইনটি করা হয়েছিল।”

“আইনটি করার উদ্দেশ্য মোটেও খারাপ ছিল না, তবে এটির চরম অপব্যবহার করছে বর্তমান সরকার। তাই আইন বড় কথা নয়, যারা ক্ষমতায় থাকেন তাঁদের উদ্দেশ্যটাই বড় কথা,” মনে করেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন।

মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৭৩২টি মামলায় এক হাজার ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে ১৬৫টি মামলায় ৩৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৮জন সাংবাদিক।

২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পর এর অপব্যবহারের আশঙ্কায় রাস্তায় মানববন্ধন করেছিলেন দেশের সংবাপত্রের সম্পাদক ও মালিকেরা।

বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দি ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বেনারকে বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমাদের অবস্থান আগের মতোই আছে।”

গত ৭ মে দেওয়া বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ জানায়, সম্প্রতি যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা-গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে পরিষ্কারভাবে তা ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতার জন্য হুমকি’।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’, ‘গুজব রটনা’, ‘সরকারের সমালোচনা’—এ ধরনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। মানহানি সংক্রান্ত প্রচলিত আইনের চেয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় বেশি আগ্রহ থেকে পরিষ্কারভাব এটিই প্রতীয়মান হয় যে, বিচার চাওয়া নয় বরং সাংবাদিকদের ভয় দেখানোই এই মামলাগুলোর উদ্দেশ্য।

তথ্য প্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন পাশ করে বিএনপি সরকার। এই আইনের বিভিন্ন ধারার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ৫৭ ধারা।

এই ধারা অনুসারে কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ কিছু প্রচার করা যাবে না, যা দেখে অথবা শুনে কেউ ‘নীতিভ্রষ্ট’ অথবা অসৎ হতে পারে।

একইসাথে ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ বিষয় প্রচারের মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে, অথবা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে অথবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে—এমন সব অপরাধের জন্য অনধিক দশ বছর এবং অনধিক এক কোটি টাকা দণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি আমলে পাশ করা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা সংশোধন করে সাজার মেয়াদ ১০ বছরের পরিবর্তে ১৪ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনের আগে বিতর্কিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ করে আওয়ামী লীগ সরকার।

আইন যখন, যার হাতে

“আজকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন,” মন্তব্য করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “কিন্তু এই বিএনপি ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার আগে বিতর্কিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন পাশ করে। এই আইনের ৫৭ ধারা ব্যাপক সমালোচিত ছিল।”

তিনি বলেন, “তখন আওয়ামী লীগ এই আইনের বিরোধিতা করে বলেছিল, এই আইনের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হবে।”

অধ্যাপক নিজাম বলেন, “বিএনপি এই আইন পাশ করেছিল যাতে ক্ষমতায় এলে তাদের কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই বিএনপির পাশ করা আইনের ৫৭ ধারায় সংশোধন এনে সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি করে।”

তিনি বলেন, “ব্যাপক সমালোচনার পর ৫৭ ধারা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের দুই মাস আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ করে। মূলত ৫৭ ধারাকে আরও কঠোর করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।”

অধ্যাপক নিজাম বলেন, “বিএনপি এখন বলছে তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করবে। কিন্তু কোনোদিন ক্ষমতায় গেলে তারা রাতারাতি এই অবস্থান থেকে সরে আসবে না, এটাই বাস্তবতা।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রাপ্তি রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন