Follow us

ইন্টারনেট মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ: ফ্রিডম হাউস

বেনারনিউজ স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2019-11-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ওই  আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীরা যাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করতে না পারেন, অথবা ভিডিও শেয়ার করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করে ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদন। ৪ আগস্ট ২০১৮।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ওই আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীরা যাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করতে না পারেন, অথবা ভিডিও শেয়ার করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করে ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদন। ৪ আগস্ট ২০১৮।
[এপি]

ইন্টারনেট মাধ্যমের ওপর সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপে যে পাঁচটি দেশ গত বছর সবচে বেশি কঠোরতা দেখিয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউস।

মঙ্গলবার অনলাইনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থাটির ‘ফ্রিডম অন দি নেট ২০১৯: দি ক্রাইসিস অব সোশ্যাল মিডিয়া’ বা ‘ইন্টারনেটে স্বাধীনতা ২০১৯: সামাজিক মাধ্যমের সংকট’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করে।

তবে এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ।

গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিশ্বের ৬৫টি দেশে জরিপ চালিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দেশগুলোর ৩৬টিতে এই বছর ইন্টারনেট স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে।

এতে বলা হয়, বিশ্বের সরকারি কর্তৃপক্ষ ক্রমাগতভাবে প্রযুক্তির ব্যবহারকে ‘ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণবাদ’ প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে টানা নবম বছরের মতো বিশ্বে ইন্টারনেটের স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে।

গত বছর বাংলাদেশেও ইন্টারনেট স্বাধীনতার অবনতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারনেট মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করেছে।

উদাহরণ হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্লথ করতে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক কমিয়ে দেওয়া, সামাজিক মাধ্যম নজরদারির জন্য কর্মসূচি এবং সাংবাদিক ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

গত বছর আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন ও ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনের সময়কালে এই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া চূড়ান্তে পৌঁছায় বলে মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে।

আগস্টে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীরা যাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করতে না পারেন, অথবা ভিডিও শেয়ার করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষ থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বলেও জানানো হয়।

ইন্টারনেট স্বাধীনতা: শোচনীয় পাঁচের এক বাংলাদেশ

ফ্রিডম হাউসের জরিপ চালানো ৬৫টি দেশে বিশ্বের ৮৭ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

দেশগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সবচে বেশি অবনতি হওয়া পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো হলো সুদান, কাজাকিস্তান, ব্রাজিল ও  জিম্বাবুয়ে। এছাড়া টানা চতুর্থবারের মতো এবারও ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সবচে খারাপ অবস্থান ধরে রেখেছে চীন।

অন্যদিকে যে ১৬টি দেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতার উন্নতি ঘটেছে, তার সর্বোচ্চে রয়েছে ইথিওপিয়া।

জরিপ করা দেশগুলোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক মন্তব্য করার দায়ে ৪৭টি দেশে নাগরিকদের গ্রেপ্তার করার ঘটনা ঘটেছে বলে জানায় প্রতিবেদন।

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ অন্যান্য আইনে বিভন্নজনকে গ্রেপ্তার অনলাইন ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন রাজনীতিবিদের ফটোশপ করা ছবি প্রচারের অপরাধে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।”

গত বছর ৪০টি দেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নজরদারি করার কর্মসূচি বাস্তাবায়ন করছে বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, “গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকার নিজেদের বিরুদ্ধবাদীদের চিহ্নিত করা, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের দমন করার জন্য বৈষম্যমূলকভাবে জনগণের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করেছে।

২০১৮ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নজরদারি করে ‘ভুয়া সংবাদ’ চিহ্নিত করার জন্য একটি কর্মসূচিতে ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ইন্টারনেট মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয় এবং ওয়েবসাইট ব্লক করা, বা কোনো তথ্য মুছে ফেলার পর এর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপিল করারও সুযোগও নেই।

সরকারের প্রত্যাখ্যান

বাংলাদেশে ইন্টারনেটের স্বাধীনতার অবনতি বিষয়ক ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনটিকে প্রত্যাখান করেছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে আমরা এমন কোনো পদক্ষেপ নেইনি যার মাধ্যমে ইন্টারনেট স্বাধীনতা খর্ব হয়। আমাদের এখানে ইন্টারনেটে সবাই যা ইচ্ছা তাই লিখে যাচ্ছে। আমি উল্টো বলব, আমরা মিথ্যা, ভুয়া সংবাদ, প্রচারণার শিকার।”

তিনি বলেন, “আমি জানি না তারা কোথা থেকে পেলো যে, আমাদের ইন্টারনেট স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। আমি এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করি।”

“কেউ কেউ না বুঝে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করছে,” মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ইন্টারনেট স্বাধীনতা কোনক্রমেই খর্ব করে না। এই আইন আমাদের রাষ্ট্রের এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাশ করা হয়েছে।”

“আমাদের ইন্টারনেট স্বাধীনতা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি,” দাবি করেন মন্ত্রী।

সামাজিক মাধ্যমের জন্য লাইসেন্স: মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটা ‘লাইসেন্স’ (অনুমতিপত্র) করতে হবে,” হবে বলে গত ৩০ অক্টোবর বেনারের কাছে করা মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার।

গত ৩১ অক্টোবর তিনি “কোন কোন (কোনো কোনো) মিডিয়া খবর প্রচার করছে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে লাইসেন্স লাগবে। এটি সর্বৈব মিথ্যা। সরকার এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি,” বলে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুকে মন্তব্য করেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য লাইসেন্স লাগবে মর্মে করা মন্ত্রীর বক্তব্যের অডিও রেকর্ড বেনারের কাছে রয়েছে।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন