Follow us

দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি: প্রিয় সাহা

পুলক ঘটক
ঢাকা
2019-07-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আয়োজিত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করেন বাংলাদেশর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা প্রিয় সাহা। ১৭ জুলাই ২০১৯।
ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আয়োজিত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করেন বাংলাদেশর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা প্রিয় সাহা। ১৭ জুলাই ২০১৯।
[ছবি: হোয়াইট হাউস]

আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯। ইস্টার্ন সময় দুপুর ১২.০০

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা সরকারি পরিসংখ্যানের আলোকেই করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা প্রিয় সাহা। তিনি বেনারকে জানান, দেশের বিরুদ্ধে তিনি কিছু বলেননি।

প্রিয় জানান, তাঁর বক্তব্যের পর দেশে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ‘বিপন্ন’ বোধ করছে তাঁর পরিবার। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্য দেশের বিরুদ্ধে ‘ভয়ংকর মিথ্যা’।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বেনারকে বলেছেন, প্রিয় সাহা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো কিছু করেননি। তবে তাঁর বক্তব্য ‘মিথ্যা ও অগ্রহণযোগ্য’। দেশে ফিরলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে বেনারের সাথে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রিয় বলেন, “আমি ভালো নেই।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে আমার পরিবার ভীষণ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার পরিবারের ছবি পত্রিকায় ছেপে দেয়া হয়েছে। আমার পরিবারে ছবি ছাপিয়ে সবার জীবনকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আয়োজনে দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে গত ১৬-১৮ জুলাই ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের দ্বিতীয় দিন অন্যান্যদের সাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয় সাহা।

ওই সাক্ষাতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ বা গুমের শিকার বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করে এ বিষয়ে তাঁর সহায়তা চান প্রিয় সাহা।

“স্যার, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এখানে ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের মানুষ ডিসঅ্যাপিয়ার্ড হয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই,” ট্রাম্পকে বলেন প্রিয় সাহা।

মুসলিম মৌলবাদীরা তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, জমি দখল করে নিয়েছে জানিয়ে প্রিয় সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেন, “কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।”

মৌলবাদীরা বাংলাদেশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায় বলেও ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে করা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে প্রিয় সাহার অভিযোগকে “ভয়ংকর মিথ্যা” বলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে প্রিয় সাহার আলাপচারিতার ভিডিও সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে জানিয়ে শনিবার এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় “বাংলাদেশ সরকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয় সাহার এই ভয়ানক মিথ্যা অভিযোগের কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং তাঁর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।”

“মনে হচ্ছে মিস সাহার এই চরম মিথ্যা ও সাজানো গল্পের পেছনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে,” মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক, যেখানে দীর্ঘকাল ধরে সকল ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করছেন।”

দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি প্রসঙ্গে প্রিয় সাহা বেনারকে বলেন “আমি দেশের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলিনি। দেশের বিরুদ্ধে আমি কোনো অবস্থাতেই কথা বলব না।”

তিনি বলেন, “যে দেশে হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় আমরা বসবাস করছি, সেই মাটির বিরুদ্ধে কেন আমি মিথ্যা কথা বলব?”

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩৭ মিলিয়ন বা তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ বা গুম বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে প্রিয় সাহা যে অভিযোগ করেছেন তার ব্যাখ্যা চাইলে তিনি বেনারকে বলেন, “আমি যা বলেছি তা সম্পূর্ণভাবে সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেই বলেছি।”

তিনি বলেন, “১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায় মিলে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ২৯ দশমিক সাত শতাংশ। বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ধরলে সংখ্যালঘু থাকার কথা ছিল ৫৩ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন বা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি। কিন্তু ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নয় দশমিক সাত ভাগ। অর্থাৎ ১৮ কোটির মধ্যে ১৭ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন বা পৌনে দুই কোটি।”

তিনি বলেন, “এখন সংখ্যালঘুদের সংখ্যা যা হওয়ার কথা ছিল তা থেকে বর্তমান বাস্তব সংখ্যা বাদ দিলে দাঁড়ায় ৩৬ মিলিয়নের মতো, হয়তো আরও বেশি। মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্বাভাবিক হার অনুসারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওই সংখ্যক বাড়তি মানুষও বর্তমানে দেশে থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই। আমি সেটাকেই সংক্ষেপে ৩৭ মিলিয়ন ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ বলে বোঝাতে চেয়েছি।”

‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ বা গুম শব্দের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হতে পারে ওই ক্ষেত্রে ‘মিসিং পপুলেশন’ কথাটা যথাযথ হতো, কিন্তু ইংরেজি আমার মাতৃভাষা না, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ শব্দটা মুখে চলে এসেছে।”

তিনি বলেন, “কিন্তু আমি এটা বলিনি যে, এদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে, বা গুম করে ফেলা হয়েছে। বলতে চেয়েছি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আরো অনেক মানুষের দেশে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নেই।”

প্রিয় সাহা বলেন, “বাংলাদেশের ৯৯ পার্সেন্ট মানুষ অসাম্প্রদায়িক। কিছু দুষ্ট লোক আছে যারা ঘটনাগুলো ঘটায়। আমার বাড়িতে যখন হামলা হয় তখন অনেক মুসলমান আমার পক্ষে এগিয়ে এসেছে।”

চলতি বছরের ২ মার্চ ও ২২ এপ্রিল দুই দফায় পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চরবানিয়ারি গ্রামে তাঁদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রিয় সাহা বলেন, “মামলা হয়েছে, পত্র পত্রিকায় সন্ত্রাসীদের নাম-পরিচয়সহ সংবাদও ছাপা হয়েছে, কিন্তু পুলিশ আজ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।”

“আমি ব্যক্তিগতভাবে সব রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলেছি, সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত গেছি, কিন্তু কোনো বিচার পাইনি,” যোগ করেন তিনি।

তাঁর গ্রামে ২০০৪ সালে ৪০টি হিন্দু পরিবার ছিল, কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১৩টি পরিবার টিকে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বেশিরভাগই দেশছাড়া, বাকিরা গ্রামছাড়া।”

এদিকে প্রিয় সাহার দেওয়া ১৯৪৭ সালের জনসংখ্যার হিসাব নির্ভরযোগ্য নয় বলে সোমবার বেনারকে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক  ড. এ কে এম নুরুন নবী।

তিনি বলেন, “১৯৪৭ সালে কোনো আদম শুমারিই হয়নি। দেশ বিভাগের পূর্ববর্তী সর্বশেষ আদম শুমারি হয়েছিল ১৯৪১ সালে।”

আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী? বেনারের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রিয় সাহা বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রেও বলেছি, আমি দেশে থাকতে চাই। আমি দেশে থাকব। আমি অবশ্যই দেশে ফিরব।”

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আমন্ত্রণে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে এসেছেন জানিয়ে প্রিয় সাহা বেনারকে বলেন, “আমি অনেকটা হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। ঐক্য পরিষদের কেউ জানে না যে আমি এখানে এসেছি।”

ফিরলে জিজ্ঞাসাবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা নয়

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বেনারকে বলেন, “প্রিয় সাহাকে পাওয়া গেলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তিনি কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে এই কথা বলেছেন। তিনি যে তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ গুমের কথা বলেছেন সেটি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে। নতুবা তাঁকে জনসমক্ষে কথা প্রত্যাহার করে বিবৃতি দিতে হবে।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো পরিসংখ্যানে তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ গুমের কথা নেই।

আনিসুল হক বলেন, “প্রিয় সাহা, কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া এই কথা বলেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তিনি যে অভিযোগ করেছেন তার পেছনে অন্য কেউ আছে।”

আইনমন্ত্রী বলেন, “রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করতে গেলে সরকারের অনুমতি লাগে। আর রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করার জন্য আমাদের দেখতে হবে প্রিয় সাহা যা বলেছেন সেটা আমাদের পেনাল কোড অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার আওতায় পড়ে কি না।”

তিনি বলেন, “প্রিয়র বক্তব্য মিথ্যা, অগ্রহণযোগ্য। তবে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার আওতায় পড়ে বলে আমি মনে করি না।”

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে প্রিয় সাহা যে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, “এ বিষয়ে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হবে।”

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের সম্মতি নেয়ার পর তা গৃহীত হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে তাঁকে নিষেধ করেছি। কারণ তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেয়া ঠিক নয়। প্রিয় সাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।”

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেয়া হবে, জানান ওবায়দুল কাদের।

ইতিমধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে প্রিয় সাহার বিরুদ্ধে ঢাকায় দুটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে পৃথক মামলা করা হয়েছে।

ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

তবে আদালত রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে।

অপর মামলাটি করেছেন ঢাকা বারের আইনজীবী সমিতির বর্তমান কার্যকরী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ইব্রাহিম খলিল।

প্রতিবেদন তৈরিতে ঢাকা থেকে সহয়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি ও কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন