Follow us

গার্মেন্টস দুর্ঘটনার জন্য মালিকদের অবহেলাকে দায়ী করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো

পুলক ঘটক
ঢাকা
2017-07-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের মানববন্ধন। জুলাই ০৫, ২০১৭।
পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের মানববন্ধন। জুলাই ০৫, ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

দুর্ঘটনায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের মৃত্যুর জন্য মালিকদের অবহেলাকে দায়ী করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। সম্প্রতি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বুধবার ঢাকায় আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এই অভিযোগ করেন শ্রমিক নেতারা।

“এই দুর্ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো কর্মস্থলে শ্রমিকদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ দেওয়ার প্রশ্নে গার্মেন্টস মালিকদের অবহেলা রয়েছে। এই প্রাণহানি যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি এর ফলে সামগ্রিকভাবে শিল্পেরও ক্ষতি হবে,” বেনারকে জানান ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান।

এমন অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পোশাক কারখানার বয়লার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঘাটতির অভিযোগ করে বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড।

সংস্থাটি বলেছে, “বয়লার দুর্ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো যে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় বয়লারগুলো নিয়মিত পরিদর্শন হয় না এবং ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আছে, যা বিপজ্জনক।”

তবে গত চার বছরে পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা পরিবেশ ব্যাপক উন্নত হয়েছে দাবি করে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমই এর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “এটি একটি দুর্ঘটনা, যা আমরা দেখতে চাই না। সব ধরনের সতর্কতার পরও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেটা অন্য দেশেও হয়।”

“আমাদের শিল্পে কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহাণির ঘটনা ঘটলে আমরাই বেশি উদ্বিগ্ন হই, কষ্ট পাই,” বেনারকে বলেন সিদ্দিকুর রহমান।

ক্রমাগত বিদেশি ক্রেতাদের তদারকির প্রশ্নে বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকদের আপত্তি থাকলেও নিজেদের পরিদর্শন কার্যক্রম আগামী তিন বছর পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার জন্য সম্প্রতি নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে এই ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট।

সোমবারের দুর্ঘটনার পর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেওয়া বিবৃতিতে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা সকলকে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে অ্যাকর্ড।

গাজীপুরের মালটিফ্যাবস পোশাক কারখানায় গত সোমবার সন্ধ্যায় সংঘটিত ওই বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৩ জন। নিখোঁজ রয়েছেন তিনজন এবং আহত হয়েছেন ৫৩ জন শ্রমিক ও পথচারী।

২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১১শ’র অধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল সরকার। কারখানাগুলো নিরাপদ করার জন্য মালিকরাও বেশ তৎপর হয়ে ওঠেন।

বৈদেশিক ক্রেতাদের দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তদারকির জন্য রিলায়েন্স ও অ্যাকর্ড নামে দুটি জোট গঠন করা হয়। উভয় জোট আলাদাভাবে বাংলাদেশের কারখানাগুলো ক্রমাগত পরিদর্শন করে চলেছে।

অবহেলার অভিযোগ

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বয়লার অপারেটর হারুনুর রশীদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের আগে সেফটি বাল্ব কয়েকবার বিপদ সংকেত দিয়েছিল। বিস্ফোরণের আগে বয়লার থেকে বিপজ্জনক শব্দ এসেছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ডাইং সেকশনের শ্রমিক সাইদুর রহমান। ডাইংয়ের কর্মীরা ভয় পেয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুই হবে না বলে বয়লার শ্রমিকেরা আশ্বাস দেয়।

ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার কারখানাটি পরিদর্শন করে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির প্রধান মো. রাহেনুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “পাঁচ টন ওজনের বয়লারটি প্রায় ১৫ বছরের পুরোনো। গত ২৪ জুলাই এর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়।”

সরকারের বয়লার পরিদর্শক মো. হানিফ বেনারকে বলেন, “দুর্ঘটনার ধরন দেখলে বোঝা যায় বয়লারটি ওভার প্রেসারে চালানো হচ্ছিল। বাল্ব খুঁজে পেলে পরীক্ষা করে জানা যাবে কী পরিমাণ ওভার প্রেসারে চলছিল।”

“কারখানার বয়লার একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। বয়লারের অবস্থা কেমন আছে তা পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য এবং সনদ নবায়নের জন্য কারখানা মালিকরাই আমাদের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেউ আবেদন না করায় আমাদের দিক থেকে বয়লারটি পরীক্ষা করা হয়নি,” জানান তিনি।

তবে বয়লার পরীক্ষা ও সনদ নবায়নের জন্য আবেদন করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন কারখানাটির কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার বিভূতি হীরা। গত ১৯ জুন এই আবেদন করা হয় বলে তিনি জানান।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গাজীপুরের উপমহাপরিদর্শক ফরিদ আহমেদ বেনারকে জানিয়েছেন, “কারিগরি সমস্যার কারণেই বিস্ফোরণ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তদন্ত শেষে বলা যাবে কী হয়েছিল, কোথায় সমস্যা ছিল কিংবা কারা দায়ী।”

নিহতদের নামে মামলা

এদিকে মালটিফ্যাবস লিমিটেড পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় নিহত তিনজন পোশাক শ্রমিককে আসামি করে মঙ্গলবার মামলা করা হয়েছে। আসামিরা হলেন বয়লার অপারেট আব্দুস সালাম, এরশাদ হোসেন ও মনছুরুল হক।

আহত শ্রমিক ও তদন্তকারীরা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করলেও কারখানার মালিক বা কোনো কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়নি। তবে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরও ৮-১০ জনকে আসামি হিসেবে রাখা হয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা জানা সত্ত্বেও আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে বয়লারটি চালু করেন বলে এজাহারে অভিযোগ আনা হয়েছে।

‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা মোতাবেক মামলাটি দায়ের করেছেন’ বলে বেনারকে জানিয়েছেন মামলার বাদী জয়দেবপুর থানার সহকারী উপপরিদর্শক আবদুর রশিদ।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বেনারকে বলেছেন, “মামলায় যে তিনজনের নাম রয়েছে মূলত তাদের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। মৃত হওয়ায় পরবর্তীতে অভিযোগপত্র থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে।”

“এ ছাড়া তদন্তকালে যাঁদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে,” তিনি জানান।

বয়লার পরিদর্শকের অভাব

বয়লার সনদ দেওয়া থেকে শুরু করে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও জনবলের অভাবে সঠিকভাবে সেটি দায়িত্বপালন করতে পারছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আর এই সুযোগে মালিকেরা মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লারগুলো সচল রাখছে। যার ফলে ঘটছে প্রাণহানি। গত সাত বছরে শুধু বয়লার বিস্ফোরণেই প্রাণ হারিয়েছেন ৯২ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে প্রায় ছয় হাজার বয়লার সচল থাকলেও পরিদর্শক রয়েছে মাত্র পাঁচজন।

বিষয়টি স্বীকার করে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের পরিদর্শক প্রকৌশলী মো. শরাফত আলী বেনারকে জানান, “বয়লার পরিদর্শনের ক্ষেত্রে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তবে জনবল বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি চলমান। আশা করছি, শিগগিরই বিষয়টির সমাধান হবে।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন