স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-06-07
Share
রাজধানীতে আপন জুয়েলার্সের কয়েকটি শাখায় একযোগে অভিযান চালায় শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ। রাজধানীতে আপন জুয়েলার্সের কয়েকটি শাখায় একযোগে অভিযান চালায় শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ। জুন ০৪, ২০১৭।
জেসমিন পাপড়ি/বেনারনিউজ

চোরাচালান ঠেকাতে দেশে প্রথমবারের মতো সরকার স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত ৪৬ বছর ধরে স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসা স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত হলে বাংলাদেশ আর স্বর্ণ চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার হবে না। একই সঙ্গে দেশের জুয়েলারি খাত একটি শিল্পে পরিণত হবে।

জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, “দেশের জুয়েলারি খাতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকলেও প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাবে এ শিল্পের তেমন বিকাশ হয়নি।”

“বাংলাদেশ স্বর্ণ চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। চোরাচালান বন্ধে একটি নীতিমালা তৈরি করে আমরা স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করে দেবো,” বলেন মুহিত।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে স্বর্ণ উদ্ধার স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের হিসেবে গত তিন বছরে ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর থেকে ১১১ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সর্বশেষ এপ্রিল ২৭ হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে মাসকাট থেকে আগত এক যাত্রীর কাছ থেকে আড়াই কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে দেশের শুল্ক বিভাগ। গত রবিবার যশোরের বেনাপোল বন্দরে ভারতে প্রবেশের সময় এক যাত্রীর কাছ থেকে দুটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।

স্বর্ণ আমদানির সিদ্ধান্ত এ পরিস্থিতির পরিবর্তন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি দিলীপ কুমার মালাকার বেনারকে বলেন, “আমরা স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করার এই সরকারি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। এর আগে বাংলাদেশে কখনই স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করা হয়নি।”

“চোরাচালান বন্ধসহ জুয়েলারি খাতের বিকাশের জন্য আমরা বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি গত ৪৬ বছর ধরে সরকারের কাছে এলসি’র মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছি। সরকার যদি তার কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানির ব্যবস্থা করেন তাহলে জুয়েলারি খাতের অনেক সমস্যা আর থাকবে না। চোরাচালান বন্ধ হয়ে যাবে,” বলেন মালাকার।

ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েছে সরকারি ‘করনীতি’র কারণে। ২০১৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি ব্যগেজ রুলের আওতায় প্রতি ভরি ১৫০ টাকা কর দিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি স্বর্ণ আনতে পারতেন।

কিন্তু ২০১৪ সালে কর বাড়িয়ে ভরি প্রতি তিন হাজার করা হয়। ফলে স্বর্ণের দাম বেড়ে যায় এবং কালোবাজারিরা তৎপর হয়ে উঠে।

“২০১৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালান ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিমানবন্দরে বেশ বড় বড় স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে,” বলেন দিলীপ কুমার মালাকার।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ ভারতে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। যে কয়েকটি চালান ধরা পড়ে তার চাইতে অনেক বেশি পরিমাণ স্বর্ণ পাচার হয়ে যায়।”

বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি হলে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হয়রানিও কমবে বলে মনে করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জেলার সর্ববৃহৎ স্বর্ণের দোকান বাংলাদেশ জুয়েলার্স এর স্বত্বাধিকারী তৌফিকুল ইসলাম বাবু বেনারকে বলেন, “স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত না থাকায় পুলিশ-প্রশাসন ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার সুযোগ পেয়ে যান।”

“আমরা সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে স্বর্ণ কিনে থাকি। তাদের অনেকেই স্বর্ণ বিক্রির সময় রসিদ দেখাতে পারেন না। কারণ হয়ত সেই স্বর্ণ তার বাবা-মা, অথবা দাদা-দাদি অথবা নানা-নানি কিনেছেন বহু আগে এবং তাদের দিয়ে গেছেন। সমস্যা হয় তখনই,” তিনি বলেন।

“বলা হয় আমরা অবৈধ স্বর্ণের ব্যবসা করছি। স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত করা হলে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না। আমরা স্বর্ণ কেনার বিপরীতে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারব,” বলেন বাবু।

বাবু বলেন, “স্বর্ণ আমদানি উন্মুক্ত হলে আমাদের দেশের জুয়েলারি খাত একটি শিল্পে রূপান্তরিত হবে। আমাদের অনেক দক্ষ কারিগর আছে; যাদের দক্ষতা ভারতের কারিগরদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।”

অনির্দিষ্টকালের জন্য স্বর্ণের দোকান বন্ধ ঘোষণা

গত রবিবার শুল্ক গোয়েন্দারা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলার্স থেকে ১৩ মণ স্বর্ণ জব্দ করে নিয়ে যায়।

এর প্রতিবাদে দেশের সব সোনার দোকান আগামী রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি।

আপন জুয়েলার্সের সোনা ও হীরা জব্দ করার সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে বুধবার দুপুর ১২টায় জুয়েলার্স সমিতির নেতারা বায়তুল মোকাররম মার্কেটের নিজস্ব কার্যালয়ে বৈঠক করেন।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বলছে, স্বর্ণ নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত তারা ধর্মঘট চালিয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন